
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দেশের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় ফের জটিলতা দেখা দিয়েছে। রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (PORV)-এ বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউনিট-১ থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই (JSC ASE) ইউনিট-১ চালু করার লক্ষ্যে ইউনিট-২ থেকে একটি PORV ইউনিট-১-এ স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্জন তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রূপপুরের সেফটি ভালভে ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে।
তবে ত্রুটি কবে মেরামত হবে কিংবা কবে থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিকল্প ভালভ স্থাপন করা সম্ভব না হলে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে কেন্দ্রের সেফটি ভালভ নিয়ে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা চালানো হলেও সেটি প্রয়োজনীয় মানে উত্তীর্ণ হয়নি। এখন আবারও পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তাদের তথ্যমতে, এ ধরনের অত্যাধুনিক সেফটি ভালভ মূলত ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি হয়। শুরুতে ইউক্রেনে ভালভ তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে পরে তুরস্ক থেকে ভালভ সংগ্রহ করা হয়।
নতুন করে ভালভ তৈরি করে আনতে হলে সময় আরও বাড়তে পারে। কারণ, এ ধরনের যন্ত্র তৈরি ও সরবরাহে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস, কখনও তারও বেশি সময় প্রয়োজন হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান PORV
রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা PORV প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এ কারণে এটিকে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভালভটিতে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউনিট-১ চালুর প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
রসাটমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান JSC ASE বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সমস্যাটির সমাধান কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল। রূপপুরের নির্দিষ্ট রিঅ্যাক্টর ডিজাইনের জন্য ভালভটি বিশেষভাবে তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক বাজার থেকে সাধারণ কোনো ভালভ এনে এটি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
সরকারি কার্যবিবরণী অনুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট ঢাকার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয়। বৈঠকে সরকারের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে রুশ পক্ষ জানায়, ইউনিট-১-এর প্রেসারাইজার PORV-এর পরীক্ষা পাঁচ সপ্তাহ ধরে কয়েক দফা ব্যর্থ হয়েছে। সমস্যার সমাধানে ভালভটির প্রধান নকশাবিদ রূপপুর প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন।
রুশ কর্মকর্তারা জানান, ভালভটি রিঅ্যাক্টরের নকশার সঙ্গে বিশেষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতিরিক্ত নকশাবিদ আনা হলেও ভিন্ন ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বাণিজ্যিকভাবে উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় বিদ্যমান সরঞ্জাম পুনরায় সমন্বয় করাই এখন প্রধান উপায়।
রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বলেন, সরঞ্জামটি ৫০ থেকে ৬০ বছর ব্যবহারের জন্য নকশা করা হয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতার জন্য এর কাঠামোগত শক্তি, স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন চলমান বিলম্বে উদ্বেগ প্রকাশ করে সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানান। রুশ পক্ষ প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও মূল্যায়নের জন্য আরও তিন থেকে চার দিন সময় চেয়েছিল। রাষ্ট্রদূত খোজিন বাংলাদেশের উদ্বেগ মস্কোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দ্রুত ফলাফল অবহিত করার আশ্বাস দেন।
ইউনিট-১-এর আরও কিছু কাজ বাকি
PORV সমস্যার পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের ইউনিট-১-এর আরও কিছু কাজ এখনো অসম্পন্ন রয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইউনিট-১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৮টি স্থাপনার মধ্যে ৪৭টি বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ইউনিট-১-এর অস্থায়ী হস্তান্তর ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশি পক্ষ PORV সমন্বয়ের পাশাপাশি ইউনিট-১-এর বাকি কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রুশ পক্ষ অসম্পন্ন কাজ শেষ করতে একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরির পাশাপাশি আরও একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
পিছিয়ে পড়ছে ইউনিট-২-এর কাজও
আগের সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিলে রূপপুরের ইউনিট-২-এ পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার কথা। এর আগে কমিশনিংয়ের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা ও পরিদর্শন সম্পন্ন করতে হবে। তবে এসব কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ইউনিট-১-এর জন্য বরাদ্দ করা কিছু সরঞ্জাম, যার মধ্যে স্পেয়ার সরঞ্জামও রয়েছে, ইউনিট-২-এর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলো এখনো পুনরায় সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এসব সরঞ্জাম নতুন করে সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং করতে হবে।
সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, ইউনিট-২ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে অস্থায়ীভাবে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। রুশ পক্ষ সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, অসম্পন্ন কাজ শেষ করা এবং ইউনিট-২ হস্তান্তরসহ পুরো কার্যক্রমের একটি সমন্বিত সময়সূচি তৈরিতে সম্মত হয়েছে।
অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ ও স্বাধীন মূল্যায়নের দাবি
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বিলম্বের মূল কারণ চিহ্নিত করে হারানো সময় পুষিয়ে নেওয়ার উপায় বের করার কথা বলা হয়েছে।
রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন। প্রয়োজন হলে আরও বিশেষজ্ঞকে চার্টার ফ্লাইটে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে ইউনিট-১-এর ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিংয়ের কাজ এবং ইউনিট-২-এর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুই পক্ষ জ্যেষ্ঠ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে। রুশ পক্ষের কারিগরি মূল্যায়ন শেষে আরও একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের জন্য কম-কার্বন বিদ্যুতের বড় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রূপপুরের দুটি ইউনিট চালু হলে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বর্তমানে দেশে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটে চাহিদামতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে এই সংকট অনেকটাই কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তরল জ্বালানি ও গ্যাসের ওপর চাপ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও কমবে বলে মনে করছেন তারা।
মূল সময়সূচি অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক দফা সময় পিছিয়েছে।
চলতি বছরে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও সেফটি ভালভের সর্বশেষ জটিলতায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।