
ট্রিলিয়ন-ডলার অর্থনীতি অর্জনে সামুদ্রিক প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষায় স্যাটেলাইট টিভি, জাতীয় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ড্রোন, বিদ্যুৎ স্বাবলম্বী পরিবার এবং হাতের ইশারাকে টেক্সট ও কণ্ঠে রূপান্তর—এমন ব্যতিক্রমধর্মী উদ্ভাবনী প্রকল্প ও মডেল নিয়ে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ অংশ নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বেলা ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টল পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের শক্তিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ অংশ নেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থেকে জমা পড়া ৪২টি প্রকল্পের মধ্য থেকে বাছাই করে পাঁচটি সেরা উদ্ভাবনী প্রকল্প ও মডেল জাতীয় মেলায় উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর গবেষক ও উদ্ভাবকদের নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদল ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জাতিসংঘ ও অন্যান্য দাতা সংস্থার অংশীজনের সামনে নিজেদের গবেষণা ও উদ্ভাবন উপস্থাপনের সুযোগ পেয়ে নির্বাচিত গবেষক ও উদ্ভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর সার্বিক তত্ত্বাবধান, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতির মাধ্যমে আয়োজনটি সফল করতে ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন চবি মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ শাহাদাত হোসেন, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এম. মাসুদুল আজাদ চৌধুরী, পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের আয়োজনে ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন প্রদর্শন, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত জাতীয় উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং উদ্ভাবন, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গবেষণা ও উদ্ভাবন বাছাই করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প, ধারণা, মডেল বা নমুনা বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক উদ্ভাবন সেক্টরের আলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সুনীল অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন-ডলারের সম্ভাবনা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরীর প্রস্তাবিত উদ্যোগটি বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন-ডলার অর্থনীতি অর্জনে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি সমন্বিত গবেষণা, উদ্ভাবন ও সহযোগিতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে মৎস্য আহরণ, মেরিকালচার, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক জ্বালানি খাতে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রকৃতিভিত্তিক দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে উৎসাহিত করা হবে।
উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে গবেষক, উদ্যোক্তা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষায় আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুর ইসলামের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত উদ্যোগে টিভি চ্যানেলের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ, ইউটিউব এবং ওয়েবসাইট যুক্ত করে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর মূল উদ্দেশ্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের চিন্তাভাবনা, উদ্ভাবন, সাফল্য ও অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ পাবে। এতে একটি ক্যাম্পাস অন্য একটি ক্যাম্পাসকে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি পারস্পরিক সমন্বিত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে।
এই প্ল্যাটফর্ম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যৌথ অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আয়োজনেও সহায়তা করবে। ফলে উদ্যোগটির লক্ষ্য শুধু একটি টিভি চ্যানেল তৈরি নয়; বরং একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটি গড়ে তোলা, যেখানে সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাম্পাস পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণার সুযোগ পাবে।
শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত করবে ‘স্কাইগার্ড’
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র শরীফ হাসানের দলগত উদ্যোগ ‘স্কাইগার্ড’। এটি একটি ড্রোন ডিটেকশন ডিভাইস, যা শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক করবে।
ডিভাইসটি ১ থেকে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা এফপিভি সুইসাইড ড্রোন শুধু শনাক্তই করবে না, ড্রোনের অ্যানালগ ভিডিও ফিড ইন্টারসেপ্ট করে ডিভাইসে থাকা ডিসপ্লেতে নিখুঁতভাবে নির্দেশ করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বা প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে পেট্রোলিং কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার মতো জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ডিভাইসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রকল্পটির একটি প্রোটোটাইপ মেলায় উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমান বাজারে থাকা অন্যান্য ডিভাইসের তুলনায় এটি ৩০-৪০ শতাংশ সাশ্রয়ী মূল্যে তৈরি করা সম্ভব। আকারে ছোট, মজবুত ও ঘনসন্নিবিষ্ট হওয়ায় ডিভাইসটি সহজেই হাতে বহন করা সম্ভব।
স্মার্ট ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ স্বাবলম্বী পরিবার
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দলগত মডেলটি সমন্বিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট করে বিদ্যুৎ স্বাবলম্বী পরিবার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতিটি ইউনিট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিতরণে ক্ষতির হার ছিল ৭.৩৮ শতাংশ এবং অবৈধ সংযোগ ও মিটার টেম্পারিংয়ের কারণে গ্রাহক পর্যায়ে আনুমানিক ৫৭ শতাংশ অ-কারিগরি ক্ষতি হয়েছে।
প্রস্তাবিত সমাধানে রয়েছে স্মার্ট এনার্জি মিটার, হোম অটোমেশন ও হাইব্রিড এনার্জি ম্যানেজমেন্ট। এটি বাস্তব সময়ের চাহিদা ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী সৌরশক্তি, ব্যাটারি ও গ্রিডকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচালনা করবে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং অধিকতর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য স্মার্ট এনার্জি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে উঠবে।
হাতের ইশারায় মিলবে কণ্ঠ ও টেক্সট
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আলিফ আল জামানের দলগত প্রকল্পের মাধ্যমে নীরব হাতের ইশারাকে কণ্ঠে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সিস্টেম বাংলা ইশারা ভাষা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে টেক্সট ও কণ্ঠে রূপান্তর করবে। এর ফলে বধির ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগের বাধা দূর হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ভাষার কারণে কোনো মানুষ পিছিয়ে থাকবে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে অংশগ্রহণ শুধু নিজেদের প্রকল্প প্রদর্শনের সুযোগ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে গবেষণার ফলাফলকে আরও কার্যকর প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক সমাধানে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
৪২টি প্রকল্পের মধ্য থেকে পাঁচটি প্রকল্পের এই নির্বাচনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণাকে আরও কার্যকর ও প্রয়োগমুখী করার যে প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে, এই অংশগ্রহণ সেই ধারাকে আরও এগিয়ে নেবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।