
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণহত্যার বিচারের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার কথাও জানান তিনি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শেষে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোট রংপুর মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
১১ দলীয় জোটের এ লংমার্চে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, জনগণের প্রতি সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। জিলা স্কুল মাঠে জায়গা না হওয়ায় আশপাশের সড়কেও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। লংমার্চের যানবাহন ও জনসমাগমের কারণে রংপুর নগরীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
বিকেল ৫টায় মহানগর জামায়াতের তালিমুল কোরআন বিভাগের সভাপতি ও কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা শাহজাহান সিরাজের কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাপনী সমাবেশ শুরু হয়।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ মোহাম্মদ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমেদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইউম সোবহানী, এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আখতার হোসেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান এমপিসহ ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
এ ছাড়া সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, এনসিপির উত্তরাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রফেসর ওমর ফারুকসহ বিভিন্ন দলের নেতারা বক্তব্য দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের কথা ভুলে গেলে তা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি হবে। রংপুরের আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, জনগণ তাদের ভোট দিয়েছিল, কিন্তু একটি দল সেই বিজয় ছিনতাই করেছে। গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে জনগণের ৬৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে বিষয়টি প্রমাণ করেছে—এমন দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁদের দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেশকে ভালোবাসি, তাই দেশ ছেড়ে পালাইনি। যারা দেশকে ভালোবাসে না, তারাই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমরা কারও ট্যাগ, হুমকি বা কোনো শক্তিকে ভয় পাই না; ভয় পাই কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে।’
উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন করা হবে।
তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিস্তা বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।’ উত্তরাঞ্চলের মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এর সফল বাস্তবায়ন দেখতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে, তা তাদের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে বলেও মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা। পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করে সৎ শাসনের উদাহরণ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, নিজ নিজ এলাকায় ধর্ম, বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে সবার অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। দেশ পরিচালনায় সৎ নেতৃত্বের প্রত্যাশা থেকেই মানুষ জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটকে ভোট দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, নৈতিক পরিবর্তন ছাড়া রাষ্ট্রের কল্যাণ সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজে চারিত্রিক উন্নয়ন, হারাম খাবার পরিহার এবং গিবত ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাবেশ শেষে রাতে রংপুরে গিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।