ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্রসিকিউটর সুলতানকে সরাতে জানুয়ারিতেই চিঠি দিয়েছিলেন তাজুল

প্রসিকিউটর সুলতানকে সরাতে জানুয়ারিতেই চিঠি দিয়েছিলেন তাজুল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদকে অপসারণের জন্য গত ১১ জানুয়ারি তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। চিঠিতে তিনি সুলতান মাহমুদ এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে তাকে অপসারণের অনুরোধ করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাজুল ইসলাম নিজেই।

এর আগে, গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগের দিনই বি এম সুলতান মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ আনেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেড় মাস আগে সুলতান মাহমুদকে অপসারণের বিষয়ে তৎকালীন আইন উপদেষ্টাকে তাজুল ইসলামের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলো।

আইন উপদেষ্টাকে পাঠানো ওই চিঠিতে তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যাদি বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন বলে তিনি জেনেছেন। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই স্বপ্রণোদিতভাবে প্রসিকিউটর হিসেবে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য আইনবহির্ভূতভাবে অন্যত্র সরবরাহ একটি বেআইনি কর্মকাণ্ড এবং তদন্ত ও বিচারাধীন স্পর্শকাতর মামলার জন্য গুরুতর নিরাপত্তাহুমকি।’

তাজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের লিফটে যাতায়াতের সময় তুচ্ছ ঘটনায় নিরাপত্তা প্রহরী মো. মাঈন উদ্দিনকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন সুলতান মাহমুদ। পরে তাকে জোর করে গানম্যান দিয়ে ধরে বার অ্যাসোসিয়েশনের অফিস কক্ষে নিয়ে প্রচণ্ড মারধর করেন। এ সময় তার শরীরে বিভিন্ন জখম হয় এবং তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ট্রাইব্যুনাল ও প্রসিকিউশন টিমের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।

প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ গানম্যানকে দিয়ে তুচ্ছ কারণে যত্রতত্র যাকে-তাকে গুলি করার নির্দেশ দেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি। তাজুল ইসলাম জানান, এই অভিযোগে এ পর্যন্ত চারজন গানম্যান স্বেচ্ছায় সুলতান মাহমুদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানান। এমন অবস্থায় তাৎক্ষণিক গানম্যান পরিবর্তন করে দিতে হয়।

তাজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সুলতান মাহমুদ তার স্ত্রীকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতন করেন। এ বিষয়ে তার স্ত্রী অভিযোগ দাখিল করেছেন।

চিঠিতে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর আরও অভিযোগ করেন, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বিভিন্ন সময়ে মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের বাসায় ডেকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক পরামর্শ, মিথ্যা তথ্য ও উসকানি প্রদানের মাধ্যমে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এমন কর্মকাণ্ড ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং আদালতের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। দায়িত্ব পালনে কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করা, দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা ও অনাগ্রহ, নিজ কর্তব্য সঠিকভাবে পালন না করা এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও গাফিলতি নিয়মিতভাবে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।

এসব কারণে প্রসিকিউটর পদ থেকে সুলতান মাহমুদকে অপসারণের অনুরোধ করেন তাজুল ইসলাম। চিঠির সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বরাবর নিরাপত্তা প্রহরী মাঈন উদ্দিনের দেওয়া অভিযোগ এবং চিফ প্রসিকিউটর বরাবর হাতে লেখা সুলতান মাহমুদের স্ত্রীর একটি চিঠিও যুক্ত করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তাদের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে দিতে পারি—সেই আশঙ্কা থেকে তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। সেই গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আগে থেকেই তারা এসব প্রস্তুত করে রেখেছিল, যাতে সময়মতো আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে। কারণ, আমি যদি অন্যায় করে থাকতাম, তাহলে তারা আমাকে শোকজ করত, নোটিশ দিত—এসব কিছুই করেনি।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হলে মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ১৬ সদস্যের প্রসিকিউশন টিমে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় নিয়োগ পেয়েছিলেন বি এম সুলতান মাহমুদ। সোমবার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল,চিফ প্রসিকিউটর,অভিযোগ,তাজুল ইসলাম,বি এম সুলতান মাহমুদ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত