অনলাইন সংস্করণ
১৮:১৭, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
ক্যানসারের মতো মারণব্যাধি যখন বারবার থাবা বসায়, তখন মানুষ হয়তো মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়ে। কিন্তু জনপ্রিয় উপস্থাপক সামিয়া আফরিনের ক্ষেত্রে গল্পটা একদম আলাদা। জীবনে যুদ্ধে তিনি মোটেও একা নন। দ্বিতীয়বার ক্যানসার ধারা পড়ার পর সম্প্রতি কেমোথেরাপি দেওয়া শুরু হয়েছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাথার চুল ঝরে যাচ্ছে তার। যদিও কেমোথেরাপির কারণে চুল ঝরে যাওয়ার কষ্ট সামিয়াকে একা বইতে দেননি তাঁর স্বামী ও সন্তান। মায়ের পাশে থেকে সাহস যোগাতে ছেলের মাথা ন্যাড়া করেছেন। পাশাপাশি স্ত্রীর নিজের চুলও ফেলে দিয়েছেন স্বামী এস এম রেজাউল ইমরান।
২০২২ সালে সামিয়ার শরীরে প্রথমবার কোলন ক্যানসার ধরা পড়েছিল। সে সময় সিঙ্গাপুরে গিয়ে জানা যায় ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মৃতিচারণ করে সামিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চিকিৎসক যখন প্রথম ক্যানসারের খবরটা দিল, ভেবেছিলাম যা হওয়ার হয়ে গেছে! এমনকি সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন শুনলাম ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে, অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপি নিতে হবে, তখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম। অনেক কান্নাকাটি করেছি। মনে হয়েছিল, এই চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন ও সাজানো পৃথিবীটা মুহূর্তেই বদলে যাবে।’
সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ইমিউনোথেরাপির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেন তিনি। ২১ দিন পরপর দেওয়া থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। সেই যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে সামিয়া বলেন, ‘প্রথম থেরাপি পর ঢোক গিলতে পারতাম না, ত্বকে প্রচণ্ড চুলকানি হতো। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় হেঁটে চলাফেরা করলেও ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের সময় যে তীব্র যন্ত্রণা হয়, কেমোথেরাপির পর আমার শরীরে অনেকটা সে রকম যন্ত্রণা হতো। তবুও আমি ভেঙে পড়িনি, শক্ত হাতে লড়াই চালিয়ে গেছি।’
দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় একটু একটু করে সুস্থ জীবনে ফিরতে শুরু করেছিলেন তিনি। তখনও চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হতো। একদিন পরীক্ষায় জানতে পারেন তার শরীরে ফের বাসা বেঁধেছে ওভারিয়ান ক্যানসার। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে ঢাকায় তাঁর কেমোথেরাপি চলছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘খাবারে এখন আর কোনো স্বাদ-গন্ধ পাই না। মুখ লাল হয়ে যায়, মাথা চুলকায়। এই কষ্ট কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। যিনি এই নরকীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাবেন, কেবল তিনিই এর তীব্রতা বুঝতে পারবেন। জেনেটিক পরীক্ষায় শরীরে জিনগত ত্রুটি ধরা পড়ায় ভবিষ্যতে অন্য কোথাও ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবুও আমি আশা ছাড়তে চাই না, বুকভাঙ্গা বিশ্বাস নিয়ে বলছি—ইনশাআল্লাহ, এই শরীর থেকে ক্যানসার চিরতরে বিদায় নেবে।’
সামিয়ার মাথার চুল পড়ে যাওয়ার তাঁকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এগিয়ে আসেন তাঁর স্বামী এস এম রেজাউল ইমরান ও ছেলে আহানাফ আরাবি। ছেলের হাতে ন্যাড়া হলো মায়ের মাথা। একটু পর মাথা ন্যাড়া করে হাজির হয় ছোট্ট আহানাফও। মায়ের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি প্রকাশ করে আহানাফ বলে, ‘মাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই আমি নিজের চুল কেটে দিয়েছি। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে, আর আমি মায়ের কথা বলার পর সবাই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’