অনলাইন সংস্করণ
১৬:২২, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিলাই। শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রসার এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এবারের শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিলাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নোবেল কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পিলাইয়ের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি বিষয় ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর আইনি কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন সব ক্ষেত্রেই এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা গেছে।
নাভি পিলাইয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিল পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ ব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতো।
এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা পিলাই পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় যুক্ত হন। তিনি আইনজীবী হিসেবে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী আন্তর্জাতিক বিচারিক কর্মজীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর বিচারক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন পিলাই। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যার পর দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। সেখানে বিচারিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার পরিসর বাড়ায়।
পিলাই পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারক হিসেবে কাজ করেন। এই আদালত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে কাজ করে।
তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ পদে থাকাকালে তিনি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে তাঁর এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল কমিটিও তাঁর এই দীর্ঘ কর্মজীবনকে পুরস্কারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
নাভি পিলাইকে পুরস্কৃত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল কমিটির মতে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো অপরাধের বিচার না হলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ বা সংঘাতের পর অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ ঠেকানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হলে সংঘাতের নিষ্পত্তিতে বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করার সুযোগ বাড়ে।
নোবেল কমিটির বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক চাপের মুখেও পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতেও এবারের পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও কাজ করেছেন পিলাই। তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম এবং ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কমিশনটি সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে সংঘটিত কথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পালন করে।
এ ধরনের তদন্তের লক্ষ্য হলো অভিযোগ ও প্রমাণ পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে আনা। তবে কোনো তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান, আদালতে অভিযোগ উত্থাপন এবং বিচারিক রায় এগুলো পৃথক বিষয়। সংশ্লিষ্ট অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলাও আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। পিলাইয়ের বিচারিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা নোবেল কমিটির মূল্যায়নে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা আনুমানিক ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।
এর আগে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো। দেশটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আন্দোলনে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৪ সালে শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠন নিহন হিদানকিও। পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সংগঠনটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও এ সম্মান পেয়েছে। ১৯০১ সালে পুরস্কার চালুর পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১১২ জন ব্যক্তি ও ২৮টি সংগঠন এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বয়সের দিক থেকেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। পাকিস্তানি শিক্ষা অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। তিনি এখন পর্যন্ত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী।
অন্যদিকে, পদার্থবিজ্ঞানী ও পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের কর্মী জোসেফ রোটব্লাট ১৯৯৫ সালে ৮৬ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা এবং পাগওয়াশ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
নাভি পিলাইয়ের এবারের অর্জন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দীর্ঘ প্রচেষ্টাকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় এনেছে। নোবেল কমিটির বার্তাও স্পষ্ট টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় শুধু সংঘাত থামানো যথেষ্ট নয়; অপরাধের বিচার, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও অপরিহার্য।