অনলাইন সংস্করণ
২১:০৩, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদে একসময় যেখানে জীবিকার সীমাবদ্ধতা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেখানে আজ আশার নতুন আলো জ্বালাচ্ছে নারীদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ‘প্রেরণা’। সংস্থাটির উদ্যোগে নারীর ক্ষমতায়ন, টেকসই জীবিকা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে এক সুতোয় গেঁথে এগিয়ে চলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন-সংলগ্ন অঞ্চলের অনেক পরিবার দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কর্মসংস্থানের সংকটে জীবনযাপন করেছে। এসব চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নারীদের ওপর। তবে ‘প্রেরণা’র সহায়তায় অনেক নারী এখন বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কেউ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কেউ হস্তশিল্পী, আবার কেউ পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবারের আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছেন।
একসময় সুন্দরবনের কোলঘেঁষা লোকালয়ে নারীদের জীবন ছিল বাল্যবিবাহ, নিরাপদ পানির অভাব, স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা আর সামাজিক বৈষম্য ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা বদলে দিতে ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠন প্রেরণা নারী উন্নয়ন সংস্থা।
প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, ‘পরিবর্তনের জন্য কাজ করা নারীদের অনেক সময় শুধু কাজ দিয়েই নয়, ব্যক্তিগত মর্যাদাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সত্য, সততা এবং মানুষের আস্থা কোনো অপপ্রচারের চেয়ে অনেক বড়। প্রেরণার পথচলা হাজারো নারীর স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প। যত বাধাই আসুক, সুন্দরবনের মানুষ এবং নারীর অধিকারের জন্য আমাদের এই পথচলা থামবে না।’
তিনি বলেন, ‘যারা পরিবর্তনের জন্য কাজ করেন, তাদের পথ কখনো সহজ হয় না। একজন নারী নেতৃত্বে থাকলে অনেক সময় তার মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং তাকে পিছনে টেনে রাখার চেষ্টা হয়। তবু আমি বিশ্বাস করি—সত্য, সততা মানুষের বাধার চেয়ে অনেক বড় শক্তি। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা মানুষের জন্য কাজ করেছি, করছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব।’
প্রেরণার যেসব প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অগ্রযাত্রা
WSI প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২০০ জন নারী উদ্যোক্তা তৈরি করেছে প্রেরণা। প্রশিক্ষণ, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন, বিপণন, বাজার সংযোগ ও ব্র্যান্ডিংসহ সব ধরনের সহযোগিতায় তারা এখন স্বাবলম্বী।
স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বিক্রি, আচার ও চিপস তৈরি, কাপড়ের ব্যবসা, দোকান, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, বীজ ভাণ্ডার, গ্রামভিত্তিক বীজ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন আয়ের কাজে যুক্ত নারীরা। বনজীবী নারীদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বনজীবী মার্কেট’।
মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙার লড়াই
সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রেরণা উপকূলীয় নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। এই পণ্য এখন বহু নারীর আয়ের উৎস।
বাল্যবিবাহ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, আইনি সহায়তা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (SRHR), জেন্ডার সমতা ও নারী নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে প্রেরণা। বর্তমানে প্রায় ১৫ জন ‘দুর্বার কন্যা’ নিজ নিজ এলাকায় কিশোরীদের অধিকার রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ১০০ জন যুব স্বেচ্ছাসেবক দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনে কাজ করছেন।
কিশোরীরা নিজেরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে
Plan International-এর সহযোগিতায় মুগলগঞ্জ ইউনিয়নে ১৩-২৪ বছর বয়সী কিশোরী ও তরুণ নারীদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে একটি প্রকল্প। এখানে SRHR, DRR ও YEE—এই তিনটি বিষয়ে কাজ হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নিজেরাই কিশোরীরা—কী কাজ হবে, কোথায় হবে, কীভাবে হবে।
নিরাপদ পানির জন্য উদ্ভাবনী উদ্যোগ
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর পুনঃখনন, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (PSF), পানি শোষণ ব্যবস্থা এবং কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শত শত পরিবার আজ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
জলবায়ু সহনশীল সুন্দরবন গড়তে কাজ
Wetlands International-এর সহযোগিতায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, পুকুর পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করছে প্রেরণা।
CNRS-এর নেতৃত্বে B4RI প্রকল্পের আওতায় কয়রা ও দাকোপে নারীদের কণ্ঠকে মূলধারায় আনা, উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার সংযোগ ও ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ চলছে।
আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণে
CJRF প্রকল্পের মাধ্যমে মুক্তা ও অন্যান্য বনজীবী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করছে প্রেরণা। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সুন্দরবন মিউজিয়াম।
কমিউনিটির সিদ্ধান্তেই উন্নয়ন
Sundarban Coalition-এর আওতায় ১৬টি সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কমিউনিটির চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রেরণা। রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, টয়লেট, কৃষি উন্নয়ন, আয়বর্ধক কার্যক্রমসহ নানা কাজে ইতিমধ্যে উপকূলের বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
যুব নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথে
Educo International-এর সহযোগিতায় নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ, অ্যাডভোকেসি, স্কিল ট্রেনিং, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ব্লু ইকোনমি ও নারীদের অধিকার
APWLD-এর সহযোগিতায় গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগে ব্লু ইকোনমির প্রভাবে উপকূলীয় নারীদের ভূমি অধিকার, জীবিকা, স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব নিয়ে কাজ করছে প্রেরণা।