
দেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) সভাপতিত্বে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই বিলের মাধ্যমে প্রায় দুই দশকের পুরনো আইনকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিলটির মাধ্যমে পূর্বে জারি করা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’কে আইনে পরিণত করা হবে।
এই সংশোধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনের মূল উদ্দেশ্যে পরিবর্তন আনা। আগে যেখানে শুধু 'স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা'র ওপর গুরুত্ব ছিল, সেখানে এখন দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগত মান, টেকসই এবং সর্বোত্তম মূল্য নিশ্চিত করার বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো আইনে 'সাস্টেইনেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (এসপিপি)' ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, টেন্ডার ডকুমেন্টে এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না যা পরিবেশের ক্ষতি করে বা শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘন করে, যেমন—মজুরি, সামাজিক সুবিধা বা শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ।
২০২৬ সালের এই বিলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অংশ হিসেবে 'রিভার্স অকশন' চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে সরবরাহকারীরা কম দামে প্রতিযোগিতা করে দরপত্রে জিতবে। এতে ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া সব সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম হলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—বিপিপিএ-কে প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং 'ফিজিক্যাল সার্ভিসেস'কে আলাদা ক্রয় ক্যাটাগরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
আইনে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ব্যবহারের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে, যার মাধ্যমে একাধিক সরকারি সংস্থা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পূর্বনির্বাচিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সহজ করতে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন বা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
দেশীয় আইটি খাত সুরক্ষায় বলা হয়েছে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত আইটি সেবার আন্তর্জাতিক দরপত্রে স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যৌথ অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ২০০৬ সালের ৬ জুলাই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি ক্রয়ে দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগত মান এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনে সংশোধন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০০৬ সালের আইনের পঞ্চম সংশোধনীতে মূল্যসীমা নির্ধারণের ফলে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় বিকল্প বিধান প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দেয়।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ক্রয় কৌশল প্রণয়ন, সাস্টেইনেবল প্রকিউরমেন্ট ধারণা চালু, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, রিভার্স অকশন চালু এবং অবকাঠামোগত সেবাকে আলাদা ক্রয় খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ মে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়, যা ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়।
এই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে বিলটি উত্থাপন করা হয়।
পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
সূত্র: বাসস