অনলাইন সংস্করণ
১৫:৪৪, ৩০ মে, ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহা দেশের চামড়া শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। প্রতি বছর সংগ্রহ হওয়া মোট কোরবানির পশুর চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই এই সময়ে সংগ্রহ করা হয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এ শিল্প থেকে প্রতিবছর প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।
কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এতিমখানা, মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও অসহায় মানুষের অধিকার। কিন্তু সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একদিকে জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রথমবারের মতো একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। “আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার মোদের দেশ গড়ার”—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয় ভিডিপি সদস্যদের
চামড়ার গুণগত মান রক্ষা ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রশিক্ষণের ওপর। খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী রেঞ্জের আওতাধীন ২৯টি জেলায় মোট ৪ হাজার ১৫৩ জন ভিডিপি সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণে চামড়া ছাড়ানোর সঠিক পদ্ধতি, পরিষ্কারকরণ, নির্ধারিত মাত্রায় লবণ প্রয়োগ, ভাঁজ ও সংরক্ষণ, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা পরে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করেন এবং স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন।
চামড়া সংগ্রহে মাঠপর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা
ঈদের দিন কোরবানি শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন। পশু জবাইয়ের পর সাধারণ মানুষকে সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দেন তারা।
চামড়ায় যেন কোনো আঁচড়, ছিদ্র বা ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়। ধারালো ও সামান্য বাঁকানো ছুরি ব্যবহার, সঠিকভাবে দাগ কাটা এবং ধীরে ধীরে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক সহায়তা প্রদান করেন সদস্যরা।
চামড়া পরিষ্কার ও সংরক্ষণে সচেতনতা
চামড়া ছাড়ানোর পর তা সরাসরি রোদে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়। চামড়ায় লেগে থাকা মাংস, চর্বি, রক্ত ও ময়লা পরিষ্কার করার কাজেও সহায়তা করেন ভিডিপি সদস্যরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিকভাবে পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হলে চামড়ার গুণগত মান দীর্ঘসময় অক্ষুণ্ন থাকে এবং বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখছেন তারা।
লবণ প্রয়োগে বিশেষ গুরুত্ব
চামড়া সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নির্ধারিত মাত্রায় লবণ প্রয়োগ। পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার না করায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।
এ কারণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি সদস্যরা একটি মাঝারি বা বড় গরুর চামড়ার জন্য ৮ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার জন্য ২ থেকে ২.৫ কেজি লবণ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তারা নিশ্চিত করেন, লবণ যেন চামড়ার ভেতরের অংশে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং ব্যবহৃত লবণে কোনো ধরনের ভেজাল না থাকে।
এছাড়া বিভিন্ন জেলার এতিমখানা ও অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্রে চামড়ার স্তূপে যথাযথভাবে লবণ প্রয়োগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তারা। ফলে পরবর্তীতে ট্যানারিতে পাঠানোর সময় চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখা সহজ হয়।
পরিবহন ব্যবস্থাপনায়ও সক্রিয় অংশগ্রহণ
চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পর দ্রুত নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ঈদের দিন পরিবহন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এ অবস্থায় স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা স্থানীয়ভাবে পরিবহন সমন্বয়, সতর্কতার সঙ্গে চামড়া গাড়িতে তোলা এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তারা সহায়তা করেন।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী রেঞ্জের ২৯টি জেলায় ৪ হাজার ১৫৩ জন প্রশিক্ষিত ভিডিপি সদস্যের এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ চামড়া সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের প্রায় ৬০ লাখ স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যের বিশাল নেটওয়ার্ককে পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে চামড়া শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক শুধু চামড়া শিল্প নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman তাঁর ‘Peoples Warfare Doctrine’ ধারণার আলোকে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সময়ের বিবর্তনে ৬০ লাখ সদস্যের এই বিশাল বাহিনী সামাজিক নিরাপত্তা, জনসচেতনতা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ভিডিপি সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।