প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ মে, ২০২২
১৩ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট এবং আবুধাবির শাসক শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মৃত্যুবরণ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন সৎভাই ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের ‘ডি ফ্যাক্টো’ (প্রকৃত) শাসক হিসেবে পরিচিত শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়া ছিল খুবই প্রত্যাশিত। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শেখ খলিফা স্ট্রোক করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ধরে রাখলেও প্রয়াত শেখ খলিফার অসুস্থতার সুযোগে তিনিই মূলত দেশটির শাসন পরিচালনা করতেন। ‘এমবিজেড’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত মোহাম্মদ বিন জায়েদ আরব বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নেতা। তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টের একজন গ্র্যাজুয়েট। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ কিছু বিতর্কিত ও দুঃসাহসিক ভূমিকার ফলে একদিকে তিনি যেমন বারবার সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি বিতর্কিত।
১৯৭১ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি তার তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর নির্ভর করে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করে। বিশেষ করে আমিরাতের সবচেয়ে বড় রাজ্য আবুধাবিকেন্দ্রিক উন্নয়ন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। আরব আমিরাতের প্রথম শাসক আবুধাবির আমির ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান চেয়েছিলেন যে, তার দেশের সম্পদ যেন জনগণের মধ্যে ভালোভাবে বণ্টন করা হয়। ২০০৪ সালে তিনি মারা যান। ততদিনে আরব আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়ে গেছে। বিগত ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় আরব আমিরাত একদিকে যেমন বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগর ও উত্তর আফ্রিকায় যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও দেশটিতে এসেছে অনেক পরিবর্তন। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ তার উচ্চাভিলাষী পররাষ্ট্রনীতির কারণে দেশটি অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বিশ্বে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান ৩৬তম। ফান্সের অধ্যাধুনিক রাফায়েল, আমেরিকার এফ-১৬, এফ-৩৫ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রায় সব অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের মজুত রয়েছে দেশটিতে। আরব আমিরাত বিশ্বের নবম অস্ত্র আমদানিককারক দেশ। দেশটির প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা ৬৫ হাজার হলেও ১৮-২০ বছর বয়সি সব নাগরিকের সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক।
মোহাম্মদ বিন জায়েদের ভিশন হচ্ছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আরব আমিরাতকে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসা। সে কারণেই লিবিয়া থেকে আফ্রিকার শৃঙ্গ, সুদান থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল- সর্বত্রই আরব আমিরাতের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোহাম্মদ বিন জায়েদ কার্যত জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে সামনে এগোচ্ছেন। তার সামনে কোনো ন্যূনতম হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তিনি সেটাকে নির্মূল করে ফেলতে বদ্ধপরিকর। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলা করতে সিদ্ধহস্ত। ইসলামপন্থি ও সেকুলার গণতন্ত্রীদের সমান হুমকি মনে করেন। তিনি আরব বিশ্বে বর্তমান শাসকদের রক্ষায় আঞ্চলিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর শাসকদের বিরুদ্ধে শুরু হয় গণআন্দোলন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সিরিয়া ও মিসরে। ফলে এসব দেশ আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মানচিত্র থেকে ছিটকে পড়ে। এই গণআন্দোলে এমবিজেড আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। গণআন্দোলনের ঢেউ কুয়েত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতেও এসে লাগে। এমবিজেড এটা অনুধাবন করেন যে, জনগণ সুযোগ পেলে তিউনিশিয়া ও মিসরের মতো উপসাগরীয় অঞ্চলেও ইসলামপন্থি দলগুলোকে ভোট দেবে। আরব বসন্তের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এমন কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার ফলে পুরো দেশের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব এমবিজেড-এর হাতে চলে আসে। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুবাইসহ অন্য কোনো রাজ্য আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি ইসলামপন্থি কোনো দল বা গ্রুপও এসময় তার সামনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারেনি।
এসময় এমবিজেড-এর হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদও ছিল। ফলে সার্বিক পরিস্থিতিই ছিল তার অনুকূলে। আরব আমিরাত উপসাগর, আরব সাগর, এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইয়েমেন সংঘাতে জড়িয়ে সেখানে নিজের অবস্থান শক্ত করে আরব আমিরাত এখন এসব অঞ্চলে তার নানা স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত জোটে যোগ দিয়ে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে আরব আমিরাত ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ওই সময় আমিরাতি সৈন্যরা অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহিদেরকে দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। এরপর ২০১৭ সালে সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিশরের সঙ্গে যোগ দিয়ে আরব আমিরাত কাতারের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। তখন এসব দেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, কাতার আরব বসন্ত ও মিসরের ইসলামি আন্দোলন মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ দেশটির কৌশলগত স্বার্থে করা হলেও পরবর্তী সময়ে আরও অনেক ক্ষেত্রেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলে আরব আমিরাত।
যে কোনো দেশ যখন ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখাতে থাকে, তখন অনিবার্যভাবে দেশটি স্থানীয় নানা বিরোধেও জড়িয়ে পড়ে। আরব আমিরাত একইভাবে আরব উপদ্বীপ থেকে অনেক দূরের বিরোধেও জড়িয়ে গেছে। আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া, সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া বিরোধেও নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। কাতারের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে গিয়ে আরব আমিরাত কাতারের মিত্র দেশ তুরস্কের সঙ্গেও বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে এরদোগানের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের জন্য ৩০০ কোটি ডলার অর্থ ব্যয় করার অভিযোগ রয়েছে আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে।
উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া তথ্য মতে, কাতারের আলজাজিরার প্রধান কার্যালয়ে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মোহাম্মদ বিন জায়েদ। ২০১৯ সালে আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পের সঙ্গে বৈঠকে তালেবান নেতাদের হত্যা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মোহাম্মদ বিন জায়েদ। ২০১৯ সালে ৫ আগস্ট স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা বাতিলের পর যখন মুসলিম বিশ্ব ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছিল, তখনই আরব আমিরাত মোদিকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে বছর ২৫ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করা হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।
লিবিয়ায় ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড’ বা ‘জিএনএ’কে সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক। অন্যদিকে এই সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতারকে সমর্থন করে আরব আমিরাত। সঙ্গে মিশর, সৌদি আরব ও ফ্রান্স। এছাড়া পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা ও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস। এই দুটি দেশের সঙ্গে হাত মেলায় আরব আমিরাত। এমনকি, তুরস্কের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এই দুই দেশের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণও করে আমিরাত। মিসরে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সফল হলেও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আরব আমিরাতের হস্তক্ষেপ বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখ দেখেছে। যেমন লিবিয়ায় আরব আমিরাত তার হিসাবে ভুল করে ফেলেছে।
এমবিজেডের ধারণা ছিল লিবিয়ার সংঘাতে জেনারেল হাফতারই জিতবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপও কোনো কাজ করেনি, এটি ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনের সংঘাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আরব আমিরাত সফলতা পেলেও উত্তরাঞ্চলে সৌদি আরব তার লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৯ সালে ইউএই তার নিয়মিত বাহিনী ইয়েমেন থেকে সরিয়ে আনে। কিন্তু তারপরও তারা ইয়েমেনের স্থানীয় মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করা অব্যাহত রাখে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদের শেষের দিকে আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও সৌদি আরব তা করেনি। এভাবে এমবিজেড নানা দিকে জড়িয়ে চারদিকে শত্রু তৈরি করে ফেলেছেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি ইসরাইলমুখী হয়েছেন। তার বাবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ ১৯৭১ সালে ইসরায়েলকে ‘শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, ‘কোনো আরব দেশই এই শত্রু থেকে নিরাপদ নয়।’ কিন্তু তার এই ঘোষণার ৫০ বছর পেরিয়ে এসে আরব আমিরাত এখন সেই শত্রু দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ার লাপিড ২০২১ সালের জুলাই মাসে আরব আমিরাত সফর করে ইসরাইলের দূতাবাস উদ্বোধন করেন।
অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর হাতে বিপুল অর্থ আর অস্ত্র থাকলেও বাস্তবে এগুলো আর্টিফিসিয়াল স্টেট। জাতিসংঘের ২০২০ সালের তথ্য অনুসারে ৮৩ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটরের দেশটির বিদেশিসহ মোট জনসংখ্যা ৯৮ লাখ ৯০ হাজার। তন্মধ্যে স্থানীয় বা আমিরাতি জনসংখ্যা মাত্র ১১ থেকে ১২ লাখ। ৩৩ লাখ ভারতীয় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৭ ভাগ। পাকিস্তানি ১৩ লাখ। জনসংখ্যার শতকরা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারত ও পাকিস্তানের পর রয়েছে দেশটির স্থানীয় জনসংখ্যার হার। ৭ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এমন একটি দেশকে কোনো না কোনো দেশের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে হয়। রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের চরিত্র অনেকটা একই রকম।
আরব আমিরাতের উল্টো দিকে ইরান। ইসরাইলের সঙ্গে আরব আমিরাতের মাখামাখি ইরান নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। আবার আরেক শক্তিশালী দেশ তুরস্কের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে আরব আমিরাত। এসব শক্তিশালী প্রতিবেশীর দেশের হুমকি মোকাবিলায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে দ্বিধাবোধ করেননি এমবিজেড। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় আরব আমিরতের ইসরাইল নির্ভরতা আরও বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে বলে অনেকের অভিমত। এ অবস্থায় নতুন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে আগামীতে সফল হবেন, না সংকটে পড়বেন- সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক