ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে ইরান

হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে ইরান

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ অচলাবস্থা দ্রুতই কাটার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ইরানের হুমকি এবং হামলার আশঙ্কায় এ সংকীর্ণ সমুদ্রপথের উভয় পাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকে আছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহের প্রধান পথও এটি।

অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আশ্বাস : জ্বালানিসংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা বলছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় পার করে দেওয়ার উপায় খুঁজছেন তিনি। তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে অনেক ক্ষেত্রেই ইরানের পাল্লা এখনও ভারী। এর একটি বড় কারণ, দেশটির অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি, যেমন- সস্তা ড্রোন ও সামুদ্রিক মাইনের ব্যবহার। অন্য কারণটি হলো ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। এ তিন বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলোর পক্ষে এ পথে জাহাজ সুরক্ষা করা বা সামরিকভাবে এ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। এ ছাড়া এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরানের জন্য আর্থিকভাবেও লাভজনক। ২৩ মার্চ ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, অন্তত দুটি জাহাজ এ পথ দিয়ে নিরাপদে যাওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু জাহাজকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার বিনিময়ে তারা এভাবে ফি নেওয়া অব্যাহত রাখবেন।

ভৌগোলিক অবস্থান ইরানের জন্য সুবিধাজনক : জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্যমতে, পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২৪ মাইল চওড়া। এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী প্রায় সব জাহাজকেই দুটি প্রধান শিপিং লেনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা আরও বেশি সংকুচিত। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) নেভাল ফোর্সেস অ্যান্ড ম্যারিনটাইম সিকিউরিটি বিভাগের সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, যৌক্তিক কারণেই একে চোকপয়েন্ট (সরুপথ) বলা হয়। বিশ্বে এমন আরও অনেক চোকপয়েন্ট থাকলেও এটি অনন্য চ্যালেঞ্জের। কারণ, এর কোনো বিকল্প পথ নেই। পণ্যবাহী জাহাজ বা সেগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সেখানে পথ পরিবর্তন করে চলাচলের জন্য খুব সামান্য জায়গা পাওয়া যায়। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জার্নাল এডিটর কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, উন্মুক্ত সমুদ্রে সব সময় রুট পরিবর্তনের সুযোগ থাকে; কিন্তু এমন চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ সমুদ্রে সেই সুযোগ নেই। এর অর্থ হলো, ইরানকে তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। তারা শুধু বসে অপেক্ষা করলেই চলে। কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, এটি কার্যত একটি ‘কিল জোন’ (মৃত্যুপুরী) তৈরি করে, যেখানে কোনো হামলার মুখে পড়ার আগে সতর্ক হওয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়।

প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূল : ইরানের প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূল রয়েছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে পারে। এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলো স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় সেগুলো ধ্বংস করা বেশ কঠিন। আর বিশাল উপকূলের কারণে ইরান শুধু এ প্রণালি নয়, এর বাইরেও হামলা চালাতে সক্ষম। কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, প্রণালির উত্তরে ইরানের অংশটি সমতল নয়। সেখানে পাহাড়-পর্বত, উপত্যকা, জনবসতি এবং অনেক দ্বীপ রয়েছে। এ ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে ধেয়ে আসা হুমকি শনাক্ত করা যেমন কঠিন, তেমনি ইরানের পক্ষে তাদের ভ্রাম্যমাণ অস্ত্র ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখা অনেক সহজ।

যে ধরনের অস্ত্রের হুমকিতে জাহাজগুলো : আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অনেক প্রথাগত নৌ সক্ষমতা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখনও সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির অপ্রচলিত সমরাস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান এবং এমনকি বিস্ফোরক বোঝাই মনুষ্যবিহীন নৌযান। চাইল্ডস বলেন, ইরান যদি মাইন পাতার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সাধারণ দেখতে কোনো পালতোলা নৌকা থেকেও তা করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের বড় সাবমেরিনগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে রেখেছে, তবে অগভীর পানিতে চলাচলকারী ‘মিজেট সাবমেরিন’ বা ক্ষুদ্র সাবমেরিনগুলোর বিষয়ে এখনও দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত