ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হালদা নদীর একাল সেকাল

হালদা নদীর একাল সেকাল

হালদা নদী শুধু চট্টগ্রামের একটি প্রধান জলপথ নয়, বরং এটি বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী যেখানে রুই জাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস) প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে। একে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সময়ের আবর্তে এই নদীতে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। গবেষকদের মতে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত হালদা নদী ছিল মা মাছের এক নিরাপদ স্বর্গ।

নদীর বাঁকগুলো (অক্সবো বেন্ড) ছিল মা মাছের বিশ্রামের আদর্শ জায়গা। কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে এর সংযোগ এবং জোয়ার-ভাটার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই নদীকে অনন্য করে তুলেছিল। স্থানীয় জেলেরা নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করে মাটির গর্তে বা ‘কুয়া’তে নিজস্ব প্রযুক্তিতে রেণু উৎপাদন করতেন, যা ছিল এই অঞ্চলের এক প্রাচীন কৃষ্টি। গত কয়েক দশকে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে হালদা তার চিরচেনা রূপ হারাতে বসেছে।

২০১৬ সালে নদী দূষণ ও অতিরিক্ত ইঞ্জিল চালিক নৌকার ব্যবহার, শিল্পের বর্জ্য, মা-মাছ নিধনের ফলে ডিমের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পাহাড়ি ঢলে লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়া মা মাছের প্রজননে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। শিল্পবর্জ্য, তামাক চাষ এবং অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। শুধু মা-মাছ নয় প্রভাব পড়েছে হালদা প্রায় ১৭০টি বিরল গাঙ্গেয় ডলফিনের আবাসস্থল। তবে গত কয়েক বছরে বালু উত্তোলনকারী ড্রেজার ও ইঞ্জিন চালিত নৌকার আঘাতে প্রায় বিলুপ্তির পথে ডলফিন। জানাযায় ২০১৭ সালে পরথেকে এই পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত ডলফিনের মৃত্যু হয়।

অর্থনীতিবীদদের মতে হালদা নদীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একক নদী হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ এই নদীর প্রাকৃতিক পোনার ওপর নির্ভরশীল।

২০২৫ সালের মে মাসে হালদা থেকে প্রায় ১৪,০০০ কেজি ডিম সংগৃহীত হয়েছে এই পরিমাণ ডিম থেকে প্রায় ৩০০ থেকে ৪১৩ কেজি রেণু উৎপাদিত হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি রেণু বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১.৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানাযায। গবেষকদের মতে সাধারণত ৪০ কেজি ডিম থেকে প্রায় ১ কেজি রেণু পাওয়া যায়। মৎস্য চাষিরা জানায় হালদার পোনা সারা দেশের পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষের প্রধান উৎস। এর স্বাদ এবং বৃদ্ধির হারের কারণে মাছ চাষিদের কাছে হালদার পোনার দাম হ্যাচারির পোনার চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি। হালদা গবেষক অধ্যাপক মনঞ্জরুল কিবরিয়া বলেন হালদা নদী দেশের মৎস্য বিজ্ঞান ও নদী গবেষণার একটি জীবন্ত ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করছে, যা নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হালদা গবেষণাগার স্থাপন তারই একটি উদ্যোগ।

তিনি জানান, হালদা নদীর মা মাছের ডিম ছাড়ার বিশেষ সময় (তিথি) তে মা মাছের ডিম ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট তারিখের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি প্রাকৃতিক কিছু অবস্থার সমন্বয়ে ঘটে, যাকে স্থানীয়ভাবে ‘জো’ বলা হয়। সাধারণত প্রতি বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুন মাস পর্যন্ত মা মাছ ডিম ছাড়ে। কার্প জাতীয় মাছেরা ডিম ছাড়ার জন্য মূলত অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিকে বেছে নেয়। শুধুমাত্র তিথি হলেই হবে না, ডিম ছাড়ার জন্য কথগুলো শর্ত পূরণ হতে হয় যেমন ১। পাহাড়ি ঢল বা প্রবল বর্ষণ হতে হবে। ২। প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে হবে। ৩। নদীতে জোয়ার-ভাটার বিশেষ টান থাকতে হবে। ৪। নদীর পানি ঘোলা ও খরস্রোতা হতে হবে। এসব লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত হলে ডিম সংগ্রহকারীরা বুঝতে পারে মা-মাছের ডিম ছাড়ার সময় হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত