
নিরাপদে নিজভূমি মিয়ানমারে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বাস্তুচ্যুত হওয়ার প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। একদিকে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরে আরও প্রায় দেড় লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন অর্থায়নের সংকটেও রূপ নিয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) এবং অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় নয় বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু রাখাইনে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।
আরআরআরসি কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠানো হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সদস্যসংখ্যার পরিবর্তন হওয়ায় নতুন করে তথ্য হালনাগাদ ও যাচাইয়ের কাজ চলছে। রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হলেই আমরা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে প্রস্তুত। কুতুপালং ক্যাম্পের মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের অনেক সন্তানই মিয়ানমার দেখেনি। বাংলাদেশে নিরাপদে আছি, কিন্তু এটি আমাদের দেশ নয়। আমরা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চাই। তবে সেখানে আবার নির্যাতন, সহিংসতা বা বৈষম্যের শিকার হলে সেই প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না।
বালুখালী ক্যাম্পের নুরজাহান বেগম বলেন, মিয়ানমার ছাড়ার সময় সবকিছু হারিয়েছি। একজন মা হিসেবে সন্তানদের স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ দেখতে চাই। ত্রাণনির্ভর জীবন নয়, নিজের দেশে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার চাই। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নয়াপাড়া ক্যাম্পের আবদুন নবী বলেন, শরণার্থী শিবিরের জীবন সীমাবদ্ধতার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের হতাশ করে তুলছে। অনির্দিষ্টকাল ক্যাম্পে বসবাস কোনো সমাধান হতে পারে না।
জামতলী ক্যাম্পের জমিলা খাতুন বলেন, নারীরাই সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন, অনেকের পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আমরা আমাদের শেকড়ে ফিরতে চাই, তবে সেই প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।
শালবাগান ক্যাম্পের ফরিদ আহমেদ বলেন, মৃত্যুর আগে একবার নিজের জন্মভূমি দেখতে চাই। আমরা কখনও বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার দাবি করিনি। আমাদের একমাত্র দাবি- মিয়ানমারে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। দীর্ঘ উপস্থিতির কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্প স্থাপনের সময় হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি কেটে ফেলা হয়েছিল। এখনও বনাঞ্চলের ওপর চাপ রয়েছে। বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সমাজকর্মী জুবাইদা বেগম বলেন, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মজুরি কমেছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কোটবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক, বাজার, পানি ও অন্যান্য জনসেবায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও আন্তর্জাতিক সহায়তার আওতায় আনা উচিত। লম্বাশিয়া ক্যাম্পের রাশেদা খাতুন বলেন, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। এতে তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পের কিশোরী নুর আয়েশা বলে, আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু অনেক মেয়েই স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। সুযোগ পেলে আমরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।কুতুপালং ক্যাম্পের ফাতেমা বেগম বলেন, নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সবসময়ই থাকে। সন্ধ্যার পর চলাফেরা কিংবা বিভিন্ন সেবা নিতে গেলেও সতর্ক থাকতে হয়। নয়াপাড়া ক্যাম্পের মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, দালালচক্র এখনও সক্রিয়। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারী ও তরুণদের পাচারের চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছে। এই অর্থ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গার জীবন থমকে আছে অপেক্ষায়।
মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে চললেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই- কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা?