ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কক্সবাজারে আমের মুকুলে বাম্পার ফলনের আশা

আবহাওয়া বুঝে পরিচর্যা
কক্সবাজারে আমের মুকুলে বাম্পার ফলনের আশা

গেল বছর অনিয়মিত বৃষ্টি ও অকাল তাপপ্রবাহে কক্সবাজারে অনেক আমচাষি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। সময়মতো আবহাওয়া পরিস্থিতি বুঝতে না পারায় মুকুল ঝরে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও ফলন হ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল। তবে এবার আগেভাগে আবহাওয়া তথ্য জেনে পরিকল্পিত পরিচর্যা করায় চাষিরা ভালো মুকুল পাচ্ছেন এবং সম্ভাব্য বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় ১০৪৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩,৩৬৫ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত আবহাওয়া পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে মাঠপর্যায়ে চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় বা অকালবৃষ্টির সতর্কবার্তা মোবাইল বার্তা ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারের রামুর আমবাগান মালিক কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গত বছর আবহাওয়া না বুঝে স্প্রে ও সেচ দিয়েছিলাম। পরে টানা বৃষ্টিতে অনেক মুকুল নষ্ট হয়। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে আবহাওয়া দেখে কীটনাশক প্রয়োগ করেছি। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিবেচনায় পরিচর্যা করায় মুকুল ভালো এসেছে।’ পেকুয়ার সৈয়দুল ইসলাম জানান, ‘এবার আগে থেকেই বলা হয়েছিল কুয়াশা কম থাকবে, তবে হঠাৎ তাপপ্রবাহ আসতে পারে। সে অনুযায়ী গাছে জৈব সার ও সঠিক সময়ে স্প্রে দিয়েছি। ফলাফল হিসেবে মুকুলের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেশি।’ উখিয়ার আম চাষি ইবনে আমিন বলেন, ‘এখন নিয়মিত আবহাওয়ার খবর রাখি। কখন বৃষ্টি হবে, কখন রোদ বাড়বে এসব জেনে সেচ ও ওষুধ দিই। এতে মুকুল ঝরে পড়া কমেছে।’ টেকনাফের বাহারছড়ার আম ব্যবসায়ী ছালামত উল্লাহ বলেন, ‘চাষিরা যদি আবহাওয়া বুঝে পরিচর্যা করেন, তাহলে ফলন ভালো হয়। এতে বাজারেও মানসম্মত আম পাওয়া যায় এবং আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়।’ টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক উদ্দিন বলেন, ‘আম গাছে প্রচুর ও সুস্থ মুকুল পেতে সঠিক সময়ভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। মুকুল ঝরা রোধে পটাশ, বোরন ও জৈব সার বিশেষ করে ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর। বোরনের ঘাটতি থাকলে মুকুল ঝরে যায়, তাই প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম বোরন মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পরপর স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।’ তিনি জানান, মুকুল আসার আগে ও পরে পটাশিয়ামযুক্ত সার প্রয়োগ করলে মুকুলের সংখ্যা বাড়ে এবং ফলের মান উন্নত হয়। গুটি মটরদানার মতো হলে প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে স্প্রে করলে গুটি ঝরা কমে। তবে ফুল ফোটা অবস্থায় কোনো ধরনের স্প্রে করা যাবে না।

মোস্তাক উদ্দিন আরও বলেন, ‘মুকুল বেশি আনার জন্য ২-৩ মাস আগে থেকে সেচ বন্ধ রাখা প্রয়োজন। আর তিন বছরের কম বয়সী গাছের মুকুল ভেঙে দেওয়া উচিত, যাতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিক থাকে। সঠিক পুষ্টি ও পরিচর্যা মেনে চললেই ভালো মুকুল ও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলার উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, ‘চলতি বছরে ১০৪৭ হেক্টর জমিতে আম আবাদ হয়েছে। রামু ও উখিয়া উপজেলায় চাষ বেশি। আমরা আবহাওয়া তথ্যভিত্তিক পরামর্শ দিচ্ছি। সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে সতর্কতা জানানো হচ্ছে। সঠিক সময়ে পরিচর্যা করলে মুকুল সংরক্ষণ ও ফলন বৃদ্ধি সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি এ মাসের শেষে উচ্চ তাপপ্রবাহ বা বড় ধরনের দুর্যোগ না হয়, তাহলে প্রায় ১৩,৩৬৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের এখন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবহাওয়া জেনে কাজ করলে ঝুঁকি কমে এবং লাভের সম্ভাবনা বাড়ে।’

চাষিরা বলছেন, আগের মতো আন্দাজনির্ভর নয়; এবার তথ্যনির্ভর পরিচর্যায় তারা আশাবাদী। আবহাওয়া তথ্যকে কাজে লাগিয়ে ঝুঁকি কমিয়ে ভালো মুকুল পাওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন কক্সবাজারের আমচাষিরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত