ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সব শর্ত পূরণেও ঝুলে আছে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন

সব শর্ত পূরণেও ঝুলে আছে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন

সিটি কর্পোরেশন হওয়ার জন্য নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করেছে ফরিদপুর। গত ৭ বছরে পৌরসভার আয়তন প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, জনসংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ, বেড়েছে রাজস্ব আয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাও। তবু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে সাত বছর ধরে থমকে আছে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম। ফলে উন্নত নাগরিকসেবা ও বাড়তি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার কয়েক লাখ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিটি কর্পোরেশন গঠনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ফরিদপুর পৌরসভার সীমানা ১৭ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার করা হয়। একই সঙ্গে ৯টি ওয়ার্ডকে সম্প্রসারণ করে ২৭টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা হয়। এতে পৌর এলাকার জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৮ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজারে।

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী জনসংখ্যা, জনঘনত্ব, আয়তন, স্থানীয় রাজস্ব আয়, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং জনসমর্থনসহ নির্ধারিত আটটি শর্তই পূরণ করেছে ফরিদপুর। বর্তমানে পৌরসভার বার্ষিক আয় প্রায় ৫১ কোটি টাকা এবং স্থানীয় উৎস থেকে রাজস্ব আয় ২০ কোটিরও বেশি। এছাড়া পৌর এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ২২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তবে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত না হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে ফরিদপুর পৌরসভার বার্ষিক বরাদ্দ মাত্র ৭৮ থেকে ৮০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, এত বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার জন্য এ বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। অপর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, মশক নিয়ন্ত্রণ, সুপেয় পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানাসংকট দেখা দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক স্থানে সড়কবাতি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করাও অর্থসংকটের কারণে সম্ভব হচ্ছে না।

সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত প্রাথমিক কমিটি (প্রি-নিকার) ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে। পরে ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় বাস্তবায়ন ও সমন্বয় কমিটির (নিকার) ১১৬তম সভায় বিষয়টি প্রথম এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়।

ওই সভায় ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলেও ‘ফরিদপুর বিভাগ প্রতিষ্ঠা সাপেক্ষে’ তা কার্যকর হবে বলে শর্ত আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে শুধু বিভাগীয় সদরদপ্তরে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকেই কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে পুরো প্রক্রিয়া।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা বিধিমালা-২০১০-এ বিভাগীয় সদরদপ্তর হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে ফরিদপুরের ক্ষেত্রে এমন শর্ত আরোপকে অনেকেই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি বিভাগীয় সদরদপ্তর না হয়েও বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন পাওয়ার পর ফরিদপুরে নতুন করে দাবি জোরালো হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ফরিদপুরে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা দ্রুত ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন এবং ফরিদপুর বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি জানান। ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা বলেন, সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়ন না হওয়ায় পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে করের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে নাগরিক সুবিধা কমছে। ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাও দ্রুত সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ফরিদপুর পৌরসভা সব শর্ত পূরণ করার পরও ৭ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে। উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিক নাগরিকসেবার স্বার্থে দ্রুত ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসবে- এমন প্রত্যাশাই এখন জেলার সর্বস্তরের মানুষের।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত