
জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে এখন মাঠজুড়ে ধানের সবুজ সমারোহ। নিচু ও সমতল জমিতে কৃষকেরা ধান চাষ করেছেন। আর উঁচু জমির একাংশে ধানের পাশাপাশি কেউ কেউ আবাদ করেছেন করোলা, পটল, বেগুন, চিচিঙ্গা, লাউ ও শসা। ফলে একই উপজেলার মাঠে একদিকে ধানের পরিচর্যা, অন্যদিকে সবজি খেতে কৃষকদের ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। উপজেলার মনঝার আমলাগাড়ি, আটিগ্রাম, বাখেরা, তেলাল কুশুমশহর, বেলগাড়ি, কৃষ্ণনগর ও জামুহালিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ধানের খেতে কৃষকের ব্যস্ততা, আবার একটু উঁচু জমিতে বাঁশ ও জালের মাচায় ছড়িয়ে পড়েছে করোলার লতাগাছ। মাচা থেকে ঝুলছে করোলা। কেউ ফলন সংগ্রহ করছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন। আবার কেউ সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।
কৃষকেরা বলছেন, ধান তাঁদের প্রধান ফসল হলেও উঁচু জমিতে সবজি চাষ বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তুলনামূলক কম সময়ে সবজি থেকে আয় পাওয়া যায়। তাই ধানের পাশাপাশি অনেকে এক বা একাধিক বিঘা জমিতে সবজি চাষ করছেন।
উপজেলার আমলাগাড়ি মাঠের কৃষক আব্দুস সোবাহান এক বিঘা জমিতে করোলা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বীজ, মাচা তৈরি, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বীজ বপনের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া শুরু হয়। এরপর প্রায় দেড় মাস ধরে খেত থেকে করোলা বিক্রি করা যায়।
আব্দুস সোবাহান বলেন, ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারদর যদি একটু ভালো থাকত, তাহলে লাভ আরও বেশি হতো। তারপরও করোলা চাষ করে মোটামুটি ভালো লাভ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার করোলা বিক্রি করেছি। আরও প্রায় ৩০ হাজার টাকার করোলা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।
একই মাঠের কৃষক সালামও এক বিঘা জমিতে করোলা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, সার ও কীটনাশকের দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় সেই খরচ পুষিয়ে মোটামুটি ভালো লাভ হয়েছে। সালাম বলেন, আমি এক বিঘা জমিতে করোলা চাষ করে মোটামুটি ভালো ইনকাম পেয়েছি। খরচ একটু বেশি হয়েছে, কিন্তু ফলন ভালো হওয়ায় লাভও হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলালে ১৩০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ হেক্টর জমিতে করোলার চাষ হয়েছে। বাকি জমিতে পটল, বেগুন, চিচিঙ্গা, লাউ, শসাসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ বেড়েছে।
হাটশহর বাখেরা, আমলাগাড়ি, নামা আটিগ্রাম, তেলাল কুশুমশহর এলাকায় এসব সবজির আবাদ বেশি হয়েছে। কৃষি অফিসের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে করোলা চাষে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। বীজ বপনের ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া শুরু হয় এবং প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত ফলন সংগ্রহ ও বিক্রি করা যায়। প্রতি বিঘায় গড়ে প্রায় ৮৫ মণ করোলা পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি মণ করোলা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে এর দাম আরও বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন কৃষি অফিস।
ক্ষেতলালের কৃষকেরা জানান, ধান চাষে ফলন পেতে কয়েক মাস সময় লাগে। অন্যদিকে করোলাসহ বিভিন্ন সবজি তুলনামূলক কম সময়ে বিক্রি শুরু করা যায়। এ কারণে যেসব জমি সবজি চাষের উপযোগী, সেখানে ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ করে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে সবজি চাষে ঝুঁকিও রয়েছে। সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও মাচা তৈরির খরচ বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আবার বাজারে দাম কমে গেলে ভালো ফলন পেয়েও প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া যায় না। এ কারণে ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন কৃষকেরা।
ক্ষেতলাল উপজেলা কৃষি অফিসের উপ সহকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষে কৃষকেরা ভালো লাভ করতে পারেন। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে কৃষি বিভাগ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মালচিং পদ্ধতিতে ফসল চাষ করলে সার ও সেচের ব্যবহার কমে। রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয় এবং ফসলের বৃদ্ধি ভালো হয়। কৃষকেরা যাতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে ভালো ফলন পান, সে বিষয়ে আমরা পরামর্শ দিয়ে থাকি।
ধানের পাশাপাশি উঁচু জমিতে বিভিন্ন সবজির আবাদ বাড়ায় ক্ষেতলালের কৃষিতে বৈচিত্র্যও তৈরি হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ তাঁদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।