
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলাজুড়ে ঘরে ঘরে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম অঞ্চলেও। জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যার অনেক বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। অনেকে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দাতে চিকিৎসা নিচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন গড়ে ৭০-৮০ জনের বেশি রোগী।প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ পৌর এলাকার বাসিন্দাদের। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী,জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ১৯৮ জন ডেজুতে আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি গত দুই মাসে
আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬৯১জন। অর্থাৎ আগস্ট মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭ জন। সেপ্টেম্বর রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৬৪৪ জন। এর মধ্যে জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৫১৮ জন রোগী। আর এ বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন আনুমানিক ১৪ থেকে ১৫ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মসজিদপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, চাঁদলাই, পোলাডাঙ্গাসহ কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু পৌর এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; জেলার বিভিন্ন গ্রামেও আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গোমস্তাপুর, নাচোল, ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ উপজেলা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে আসছে। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর বেশির ভাগ চাঁপাইনবাবগঞ্জের। রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থান প্রথম।
সরকারি হিসাবে জেলা হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা মাত্র ৩ জন বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা হাসপাতাল থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে রেফার্ড হওয়া কয়েকজন পথেই মারা গেছেন।
পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পোল্লাডাঙ্গা গ্রামে গত এক মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছেন। তারা হলেন—মন্টু আলী, কবির হোসেন, সাগর কর্মকার ও আব্দুল করিম। এদের মধ্যে তিনজনেরই বয়স ২৫ থেকে ২৬ বছর। এছাড়া ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মসজিদপাড়ায় আরও ৪ থেকে ৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন সাবেক কাউন্সিলর মাসিদুল হক নিখিল। পোল্লাডাঙ্গা পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা আবু রায়হান জানান, তার পরিবারের সবাই একে একে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং গত মাসে তার ছোট চাচা করিম ডেঙ্গুতে মারা যান। গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন ডেঙ্গু রোগী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় এডিস মশার ঘনত্বের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের। গত সেপ্টেম্বর মাসে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উদ্যোগে ৫ দিন পৌর এলাকার ১৫০টি বাড়িতে কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে ৫৪টি বাড়িতেই পাওয়া গেছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা। অর্থাৎ জরিপ করা প্রায় ৩৬ শতাংশ বাড়িতেই রয়েছে এডিস মশার প্রজননস্থল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম শাহাব উদ্দীন বলেন, ' শহরের বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা'র ঘনত্ব ৩৬ ব্রুটো ইনডেক্স। এটি উদ্বেগজনক ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি '।
জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য প্রথমে ২০টি বেড চালু করা হলেও রোগীর চাপ বাড়ায় তা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন ভর্তি থাকছে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী। শয্যা সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে অনেকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) মাহবুব হাসান জানান, বেড সংকট থাকলেও ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই। ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় ৮টি টিম গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন গঠিত টিমে রয়েছে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য ও স্কাউটস সদস্যরা। এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিদিন বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা। এর পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোরদার অভিযান চলছে। ওয়ার্ডের টিম লিডার ও পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম জানান, গত তিন সপ্তাহ ধরে এই ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে বিশেষ অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অভিযানের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ওয়ার্ডটির ৩০থেকে ৪০টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করা হয়েছে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি, মশার লার্ভা পাওয়া যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৪ জন বাড়ি মালিককে জরিমানা করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, ' ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে যে সব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সে সব এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় ৮ টি বিশেষ টিম করে দেয়া হয়েছে। তাদের তত্ত্বাবধানে মশক নিধন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা হচ্ছে। আশা করা যায়, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে'।