
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে মানুষের ঢল নেমেছে। দাওয়াত নেই, পত্র নেই, তবুও সব পথ যেন এসে মিশে গেছে মরা কালী নদীর তীরে। কুষ্টিয়া শহর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা ছেঁউড়িয়া। কিন্তু এখন সে রাস্তায় যেতে সময় লাগছে ঘণ্টার ওপরে। সাধু-গুরু বাউলেরা ছাড়াও সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড়ই বেশি। গতকাল রোববার বাউলের চারণভূমিতে আসা হাজার হাজার লালন-ভক্ত, সাধু-গুরু কর্তৃপক্ষের দেয়া সকালের অধিবাসে পায়েশ ও মুড়ির বাল্যসেবা নেন। দুপুরে তারা মরা কালীগঙ্গায় গোসল সেরে ইলিশ মাছ-ভাত ও ত্রিব্যঞ্জন দিয়ে (তিন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি) দুপুরের খাবার পুণ্যসেবা গ্রহণ করেন। পুণ্যসেবা গ্রহণ কেন্দ্র করে দুপুর ১টায়, লালন একাডেমির প্রধান ফটক তখন বন্ধ। ভিতরে লাইন দিয়ে কলাপাতা সামনে নিয়ে হাজার হাজার সাধু ফকিরের অপেক্ষা। সবাই খাবার পাবার পর বিশেষ আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো বিতরণ শেষ। এবার খাওয়া শুরু হলো একযোগে। ইলিশ মাছ, ভাত ও সবজি দিয়ে প্রায় ৫ হাজার বাউল, সাধু ফকির পুণ্যসেবা গ্রহণ করেন। এছাড়াও দই মিষ্টি খাওয়ানো হয়। দাওয়াত ছাড়াই মানুষ ছুটে আসে দলে দলে, হাজারে হাজারে। কোন সে উদাসী ডাকে তা কেউ জানে না। মূল গেট থেকে ভেতরে ঢুকে অডিটোরিয়ামের নিচে বসে প্রবীণ বাউল নহির শাহ। বয়স প্রায় ৮০ বছর।
শিষ্যদের নিয়ে গানে মজেছিলেন। এখনো আটা স্বাস্থ্য। দেখে বোঝা যায় না বয়স। গান থামালে কথা হয় এ বাউলের সাথে। গান দিয়েই শুরু করেন কথা। 'খাচার আড়া পড়লো ধ্বশে পাখি আর দাড়াবে কিসে' 'খাচার ভিকর অচিন পাখি কবনে আসে যায়'।
এই দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথায় যায়না জানি । গানের মর্ম কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন বুঝে নিতে হবে। লালন সাঁইজির মৃত্যুর পর তিরোধান দিবসে প্রতিবছরের মতো এবারও সাধক লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ প্রাণের টানে ছুটে আসেন। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। একইসঙ্গে চলছে দীক্ষা পর্ব।
নব্য শিষ্যরা গুরুদের সেবা করতে উদগ্রীব। যেন কোন কষ্ট না হয় সেদিকে তাদের অটুট লক্ষ্য। যশোর থেকে আসা নব্য বাউল ফকির আসলাম জানান, এ পথে আসা দু'মাস হয়েছে। এখনো কিছুই শিখতে পারিনি। গুরু সাথেই থাকি দিনরাত। তার খেদমত করায় আমার কাছ। গুরু বলেছে সময় হলে গুরু বাক্য দেয়া হবে। বাউলসাধক ফকির লালন সাঁইজির জীবন-কর্ম, জাতহীন মানবদর্শন, মরমি সংগীত ও চিন্ত-চেতনা এখন আর এই ছেঁউড়িয়ার গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের সীমানা পেরিয়ে তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। তাঁর সংগীত ও ধর্ম-দর্শন গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো.তৌহিদ বিন-হাসান'র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিকেল ৩টায় ৩দিনব্যাপী বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসের (মৃত্যুবার্ষিকী) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী (এমপি)। গেস্ট অব অনার ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, (এমপি) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. রশিদুল নবী।
বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ, সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া-৪ সাবেক সংসদ সদস্য,বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, স্বাগত বক্তা রাখেন বিশিষ্ট লালন সাধক হৃদয় শাহ, ও বিশিষ্ট লালন সাধক মিজ্ আসমা খানম প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, কুষ্টিয়া এক দিন সত্যিকারের লালন নগরীতে পরিণত হবে এবং এখানে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে। গড়াই ও মধুমতি নদীতে আবারও যেন নৌকা চলাচল করতে পারে, সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, লালন সাঁই প্রায় ১১৫-১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন এবং তার তিরোধানের পর ১৩৬ বছর পার হয়ে গেছে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি জাতি, ধর্ম, লিঙ্গসহ যে কোনো ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে কথা বলেছিলেন। বর্তমানে পৃথিবী যে কারণে অশান্ত হয়ে উঠছে, লালনের ভাবাদর্শ ঠিক সেখানেই কাজ করতে পারে। কেবল বিশ্বেই নয়, বাংলাদেশের মাটিতেও এ ধরনের পরিচয়বাদী রাজনীতি ও সংঘাত সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এসব বিভেদের রাজনীতি রুখতে লালনের দর্শন অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে থাকবে এসআরবি ও সাদা পোষাকে গোয়েন্দা পুলিশ। লালন সাঁইজির মৃত্যুর পর তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়িতে ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে সাধুসঙ্গে সারা রাত গান-বাজনা ও নানা তত্ত্ব কথা আলোচনা করতেন।
সাঁইজির দেহ ত্যাগের পরও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। সারা আখড়াবাড়ি ও মাঠই এখন গানের মঞ্চ। ছোট ছোট বাউল পরিবারেই চলছে গান। "সময় গেলে সাধন হবে না" 'এই মানুষে আছে রে মন, যারে বলে মানুষ রতন, ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে, বদ হাওয়া লেগেছে পাখির গায়, বাড়ির পাশে আরশিনগর, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই কুল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, সত্য বল সুপথে চল, এলাহি আলামিন গো আলা বাদশা আলমপনা তুমি'এরকম অসংখ্য লালন সংগীতের সুরের মূর্ছনা রাতে লালন একাডেমির শিল্পী ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাউলেরা পরিবেশন করেন। এছাড়া লালন মাজারের আশপাশে ও মরা কালী নদীর তীর ধরে বাউলেরা ছোট ছোট আস্তানা গেড়ে সাঁইজিকে স্মরণ করেছেন তার অমর বাণী পরিবেশনের মাধ্যমে। লালন উৎসবে অস্থায়ী দোকানগুলোয় উপচেপড়া ভিড়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলার মাঠের স্থায়ী মঞ্চে বসে আলোচনা সভা। এরপর শুরু হয় লালন একাডেমির শিল্পীদের গান।