ঢাকা রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সাত মাস ডুবে থাকে তিন ফসলির ১০০ বিঘা জমি

সাত মাস ডুবে থাকে তিন ফসলির ১০০ বিঘা জমি

বছরের সাত-আট মাস পানির নিচে থাকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জলাবদ্ধতায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর (প্রায় ৯৩.৪৩ বিঘ) আবাদী কৃষিজমি। এসব জমিতে কৃষকরা বছরে একবার বোরো ধানের আবাদ করতে পারেন। অথচ জলাবদ্ধতা দূর করা গেলে আমন ও আউশ মৌসুমে আরও প্রায় ১০ হাজার টন ধানসহ অন্যান্য শস্য উৎপাদন সম্ভব হতো।

কৃষকদের অভিযোগ, ছোট-বড় অসংখ্য জিকে সেচ খাল থাকলেও পানি নিষ্কাশনের জন্য পরিকল্পিত নালা নেই। যেসব খাল রয়েছে, সেগুলোও নিয়মিত সংস্কার করা হয় না। কোথাও খাল ভরাট করে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, আবার কোথাও বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ। ফলে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতায় পড়ে থাকছে তিন ফসলি জমি। ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন, লোকসান গুনছেন কৃষকরা। সরেজমিন উপজেলার বহলবাড়ীয়া, চাঁদপুর, বাঁশআড়া, বাঁখই, করাতকান্দি ও জগন্নাথপুর বিল ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। পানিতে জন্মেছে কচুরিপানা, কলমি, শাপলাসহ নানা ধরনের আগাছা। কেউ ডিঙি নৌকায় মাছ ধরছেন, আবার কেউ চলতি মৌসুমে আবাদ করতে আগাছা পরিষ্কার করছেন। চাষাবাদে লোকসানের কারণে অনেকে জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন। বিলসংলগ্ন খালগুলোতেও পুকুর কাটা হয়েছে। কোথাও নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ি ও রাস্তা। সংস্কারের অভাবে অনেক খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে না। নন্দলালপুর ইউনিয়নের বহলবাড়ীয়া বিলের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, তার ১৬ বিঘা জমি রয়েছে। ১০-১২ বছর আগেও খাল দিয়ে গড়াই নদীতে পানি চলে যেত। তখন বছরে তিনবার ধান চাষ করা যেত। এখন পানি বের হতে না পারায় কোনোমতে এক ফসল হয়।

একই বিলের কৃষক মাজেদ আলী বলেন, চারদিকে নদী থাকলেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। জমিতে কচুরিপানা ও আগাছা জন্মেছে। সেগুলো পরিষ্কার করতেই প্রতি বিঘায় ছয়জন শ্রমিক লাগে। এতে চাষাবাদের খরচ বাড়লেও উৎপাদন ও লাভ কমে যাচ্ছে। গোবিন্দপুর বিলের কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, কোথাও খাল নেই, আবার কোথাও খাল থাকলেও তা পরিষ্কার করা হয় না। ফলে জমিতে পানি জমে থাকে। বছরে একবারের বেশি ফসল হয় না। পরিকল্পিত খাল খনন করা গেলে এসব জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব। উপজেলার সদকী ইউনিয়নের করাতকান্দি বিলে তিন বিঘা জমি রয়েছে ষাটোর্ধ্ব কৃষক আজাহার বিশ্বাসের। তিনি বলেন, নালার অভাবে কৃষকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একবার চাষে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পাওয়া যায়। সেই আয় আগাছা পরিষ্কারের খরচেই শেষ হয়ে যায়। বছরে দুই বা তিনবার চাষ করা গেলে কৃষকরা লাভবান হতেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা ও ডাকুয়া নদীবেষ্টিত এ উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর পরিমাণ আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে নন্দলালপুর ইউনিয়নে ২৯০, সদকীতে ২৫০, জগন্নাথপুরে ২৪০, শিলাইদহে ২০৫, যদুবয়রাতে ৭৫, কয়াতে ১২০ এবং চাপড়া ইউনিয়নে ৭০ হেক্টর জমি রয়েছে। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৪ সালে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ ছিল ৫১০ হেক্টর। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ায় প্রতিবছর জলাবদ্ধ জমির পরিমাণও বাড়ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, চলতি বছর প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে। এসব জমিতে শুধু বোরো মৌসুমে ৬ হাজার ২২৫ টন ধান উৎপাদন হয়। আমন ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদ করা গেলে আরও ১০ হাজার টন শস্য উৎপাদন সম্ভব হতো। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সরকারের চলমান খাল খনন প্রকল্পে কুমারখালীর দুটি খালের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খনন প্রকল্প শুরু হলে কিছুটা জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।

এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি বিভাগ, কৃষক, বিএডিসি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত