প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫
আবুল সাহেব প্রতিদিনের মতো আজও খুব ভোরে ‘শ্রম হাট’-এ এসেছিলেন। কিন্তু অন্যদিনের তুলনায় আজকের হাটের চিত্রটা বেশ ভিন্ন। আবুল সাহেব একজন দক্ষ রাজমিস্ত্রি। বছর পাঁচেক আগেও এই হাটে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তার ডাক পড়ত। কিন্তু আজ, তাঁর পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে আরও বহু নতুন মুখের ভিড়। সবার চোখে-মুখে একরাশ হতাশা।
আবুল সাহেব হাটের একপাশে দাঁড়িয়ে তার অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে চারপাশটা জরিপ করছিলেন। পুরোনো ঠিকাদারদের প্রায় কেউই নেই। হাটের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দু-চারজন নতুন ঠিকাদারও খুব সতর্ক। তারা শুধু অল্প কিছু শ্রমিক খুঁজছেন, তাও খুব কম মজুরিতে।
তার পাশে দাঁড়ানো তরুণ শ্রমিক মফিজ। মফিজ বেশ কয়েকদিন ধরেই আসছে; কিন্তু কাজ পায়নি। মফিজ ফিসফিস করে বলল, ‘আবুল ভাই, মনে হচ্ছে আজকাল আর ইটের দরকার হয় না। সব কাজ যেন বাতাসেই হয়ে যাচ্ছে। কেউ আর বাড়ি বানাতে চাইছে না।’
আবুল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মফিজের কথায় যুক্তি আছে। নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় হাটের চিত্র এমন হয়েছে। শুধু মফিজ নয়, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি, কাঠের মিস্ত্রি, জোগালি-সবারই একই অবস্থা। হঠাৎ হাটের এককোণে শোরগোল শুরু হলো। জানা গেল, একজন বড় ঠিকাদার এসেছেন এবং তিনি এক বিরাট প্রকল্পের জন্য লোক খুঁজছেন। সবাই সেদিকে ছুটে চলল। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা গেল, ঠিকাদার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কথা বলছেন এবং তার জন্য খুব কম সংখ্যক শ্রমিক লাগবে। শ্রমিকদের ভিড় হতাশ হয়ে পাতলা হয়ে গেল।
আবুল সাহেব হাটের বটগাছটার নিচে এসে বসলেন। আকাশ মেঘলা হয়ে আসছিল। তার মনে হলো, এই মেঘলা আকাশ যেন হাটের শ্রমিকদের মনের অবস্থাকেই তুলে ধরছে। প্রযুক্তির উন্নতি আর অর্থনৈতিক মন্দা, এই দুইয়ের চাপে ঐতিহ্যবাহী শ্রম বিক্রির এই হাট যেন তার জৌলুস হারাচ্ছে।
আবুল সাহেব পকেট থেকে বিড়ি বের করলেন, ধরালেন। ধোঁয়ার সাথে মিলিয়ে গেল তাঁর আজকের দিনের রোজগারের আশা। শ্রম বিক্রির এই হাটে আজ কাজ মিলল না। কাল যে কী হবে, তা কেউ জানে না।
দিনমজুর হলেন এমন শ্রমিক যারা একদিনের জন্যও মজুরিতে কাজ করেন এবং যাদের কাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি থাকে না। তারা সাধারণত কায়িক শ্রমের কাজে নিযুক্ত থাকে। তাদের দৈনিক মজুরি পরিশোধ করা হয় এবং প্রায়শই তাদের শ্রম অধিকার ও সুরক্ষা আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়। এদের মধ্যে অনেকে শ্রম বিক্রির জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষাগত থাকেন (যেমন শ্রম বাজার বা ‘মানুষ বিক্রির হাট’) কাজের খোঁজে সমবেত হন, যেখানে তারা দৈনিক মজুরির বিনিময়ে তাদের শ্রম বিক্রি করার জন্য ক্রেতা বা নিয়োগকর্তার জন্য অপেক্ষা করেন। এই দিনমজুররা প্রায়শই কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ বা অন্যান্য দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। কাজের অভাবে শ্রমিকরা অনেক সময় কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন হাটবাজারে এখন পণ্যের মতো দরকষাকষি করে কেনাবেচা হচ্ছে মানুষের শ্রম। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভাবী মানুষ দলে দলে এ সকল হাট-বাজারে শ্রম বিক্রির জন্য আসেন। এদের শ্রম বিক্রি হয় দিন, সপ্তাহ কিংবা মাস চুক্তিতে। দুই পক্ষের মধ্যে কেনাবেচা তথা মজুরির ব্যাপারে দফা-রফা হবার পর শেষ হয় বিক্রি পর্ব। শ্রম বিক্রি করা এসব অভাবী মানুষগুলো অবস্থাসম্পন্ন জোতদার, মহাজন, অবস্থা সম্পন্ন কৃষকের সঙ্গে পিছু পিছু তাদের বাড়ি যান। সঙ্গে থাকে নিজের দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড়-চোপড়ের পুটলী, ধানকাটার কাস্তে, কাটা ধান বহনের উপযোগী বাঁশের লাঠি। মানুষের শ্রম কেনাবেচা এ হাটে সুঠামদেহী কমবয়সী লোকের দাম তুলনামূলক বেশি, শারীরিকভাবে দুর্বল, রোগা আর বয়স্কদের দাম তুলনামূলকভাবে কম।
ধানকাটা ও ধানের চারা রোপণের মৌসুমে এসব শ্রমজীবীদের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময়টায় মজুরী ও বাড়ে সমান তালে। স্থানীয়রা জানায়, বাজারে শ্রম বিক্রি হতে আসা এ সব শ্রমজীবী মানুষগুলো যে দিন নিজের শ্রম বিক্রি করতে পারেন না, সেদিন তাদের রাত কাটে বাজারের কাছাকাছি কোন মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা স্কুল ঘরের বারান্দায়। কখনও আধা পেটে বা কখনও উপোষ করে রাত কেটে যায় তাদের। সকাল হতেই আবার শ্রম বিক্রির আশায় চলে ছোটাছুটি।
এ সকল হাট-বাজারে শ্রম বিক্রি করতে আসা অভাবী মানুষদের বেশিরভাগেরই বাড়ি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের খোঁজে ছুটে আসা অভাবী মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব এলাকায় শ্রম বিক্রি করে তারা যা আয় করবে তা বাড়ি নিয়ে পরিবারের ভরণ-পোষণ ও অন্যান্য কাজে লাগান। কৃষির ভরা মৌসুমে তাদের এলাকায় শ্রমিকের মজুরী খুব কম। তবুও মৌসুমে তারা তাদের এলাকায় কাজ করেন। এলাকায় করার মতো কোন কাজ না থাকলেই তারা বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। আসেন নোয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ তুলনামূলক স্বচ্ছল জেলাগুলোতে। বিভিন্ন এলাকায় ধানকাটা ধানের চারা রোপণ ও অন্যান্য কাজ করে কিছু রোজগার করে বাড়ি ফিরে যান। এভাবেই কাজের মৌসুমে এদের অনেকেই ছুটে আসেন এসব এলাকায়, রোজগার মৌসুমে হলেও এটা তাদের পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও আর্থিক সচ্ছলতা এনে দেয়।
বাংলাদেশে মানিকগঞ্জের নবীন সিনেমা হলের পাশ, কুমিল্লার বিজয়পুর বাজার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজার রেল স্টেশন এবং মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের মতো স্থানগুলোতেও শ্রম বিক্রির উল্লেখযোগ্য হাট বসে। এই হাটগুলোতে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুররা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজ, যেমন- কৃষি, নির্মাণ, ধানকাটা ইত্যাদির জন্য শ্রম বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ অশিক্ষিত দিনমজুর (শ্রমিকদের) কাজের অভাবের প্রধান কারণগুলো হলো : অশিক্ষিত শ্রমিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব রয়েছে, যা তাদের আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য অনুপযুক্ত করে তোলে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা চাকরির সুযোগের তুলনায় বেশি হওয়ায় বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়লেও, মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবে অনেক শিক্ষিতও কর্মহীন থেকে যাচ্ছেন, যা অশিক্ষিতদের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দেশীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, যা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ আরও সংকুচিত করে তুলছে। অনেক অভাবী মানুষ কাজের সন্ধানে বিভিন্ন শ্রম বিক্রির হাটে ভিড় করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি করে তোলে।
কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অনেক কৃষি শ্রমিকের হাতে কাজ থাকে না। অনেক অভাবী মানুষ কাজের সন্ধানে বিভিন্ন শ্রম বিক্রির হাটে ভিড় করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি করে তোলে। কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অনেক কৃষি শ্রমিকের হাতে কাজ থাকে না। মহামারি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যায়, যার ফলে কাজ পাওয়ার সুযোগও কমে যায়।
একজন দিনমজুর মানুষ যখন কাজ করে, তখন তার হাতে শুধু হাতুড়ি বা শাবলই থাকে না-থাকে এক ছায়ালিপি, থাকে হৃদয়ের ভেতর থেকে উঠে আসা ছন্দ, যাহা এক অদ্ভুত আত্মানুভূতির প্রকাশ। যেমন- গভীর নলকূপের শ্রমিকরা যখন লোহার পাইপ বসানোর সময় ‘ও-ইহ, এক্কা জোরে, হে-হো!’- এমন ছন্দময় ধ্বনি উচ্চারণ করে থাকেন। একইভাবে ঠেলাগাড়ির চালকরা রাস্তায় চলতে চলতে বলেন, ‘চলো রে, ওরে ঠেল ঠেল ঠেল!’, কিংবা ‘এই যাই রে ভাই!’। যখন স্রোতের বিরুদ্ধে নৌকা টেনে নিয়ে যাওয়া হয় বা জাল ফেলা হয়, তখন মাঝিরা গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন- ‘তোরা টান রে মাঝি, বাঁচাও মাঝির প্রাণ,/জাল ফেলেছি গভীর জলে, তুলবো সোনা ভোরবেলা। ’অন্যদিকে, নদীর ঘাটে বড় ট্রলার কিংবা লঞ্চ যখন ভেড়ানো হয়, তখন দলবদ্ধ শ্রমিকদের গলায় ওঠে তীব্র উচ্চারণ-‘হেই-হো! টান দে, ওরে ভাই!’, কিংবা ‘এক্কা-দুই, টান মার!’।
কখনও বা তারা গান ধরেন- টানরে ভাই টান, পাড়ে তুলবো প্রাণ, নদীর বুকে ভাসে মাল, ঘামে ভিজে জান।’ নির্মাণ শ্রমিকদের সম্মিলিত ধ্বনি- ‘হেই-হো! হেই-হো! -‘ঢালায়ে ঢালায়ে বেলা যে গেল,/এ দালান যত উঁচা হয়, ততই জীবন ভালো। ’ইট শ্রমিকদের মুখেও শোনা যায় ছন্দময় ধ্বনি;- ‘এক দুই তিন, এইবার ছাড়!’। শ্রমজীবী নারীরাও ধান কাটতে কাটতে কিংবা মাঠে কাজ করতে গেয়ে ওঠেন- ‘ধান কাটি, গাই গান,/এই জীবনের শেষ মান।/ঘাম মুছি আঁচলে,/আকাশ দেখে থাকি চলো।
বাংলাদেশে অশিক্ষিত দিনমজুর বা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের উচিত অক্ষর জ্ঞান থেকে শুরু করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক (টিভেট) প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচি জোরদার করা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে শ্রমবাজারের সুযোগ তৈরি করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রণোদনা দেওয়া ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এছাড়াও, শ্রম আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং শ্রম পরিবেশ উন্নত করার উপর মনোযোগ দেওয়া জরুরি।