প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
রাস্তার ধারে, ফুটপাতের কোণে কিংবা জনবহুল রেলস্টেশনের পাশে; প্রতিদিনই আমরা কিছু মুখ দেখি, যাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই কিংবা নিশ্চিত খাবারও নেই। এরা হলো পথশিশু। সমাজের এই অসহায় শিশু, যাদের শৈশব হারিয়ে গেছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রামে। তাদের জীবনে নেই নিরাপত্তা, নেই ভালোবাসা বা যত্ন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা আর অবহেলায় তারা বড় হয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, তারাও আমাদের মতোই মানুষ, তাদেরও স্বপ্ন আছে, সম্ভাবনা আছে। সঠিক পরিচর্যা পেলে এই পথশিশুরাই হয়ে উঠতে পারে দেশের মানবসম্পদ এবং জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার।
বাংলাদেশে রাস্তায় থাকা শিশুদের সংখ্যা ও তাদের জীবনচিত্র অত্যন্ত উদ্বেগের জন্ম দেয়। ইউনিসেফের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৩.৪ মিলিয়নেরও বেশি শিশু রাস্তায় থাকে বা রাস্তায় কাজ করে এবং অভিভাবকবিহীনভাবে অবস্থান করে। এর চাইতেও গুরুতর তথ্য হলো, রাস্তায় জীবনযাপনরত এই শিশুদের প্রায় ৭১.৮% শিশু পড়তে ও লিখতে অক্ষম।
আশঙ্কার বিষয় হলো, পথে থাকা বেশিরভাগ শিশুর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই; এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৮.২% পথশিশুর জন্মনিবন্ধন নেই, যার ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই অবস্থা শুধু এককভাবে শিশুদের জন্যই বিপজ্জনক নয়, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পথশিশুদের রাস্তায় চলে যাওয়া বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রধান কারণ হলো চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, অভিভাবকের অক্ষমতা বা অনুপস্থিতি- গবেষণায় দারিদ্র্যই প্রথম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। তাই তাদের পরিবারের সঙ্গে বা নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই দরকার পরিবারের অবস্থান চিহ্নিত করা, অভিভাবকদের দক্ষতা উন্নয়ন করে আয়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান। পরিবারের মাঝেই শিশুদের রাস্তায় যাওয়া রোধ করতে পারলে ঘরে ফেরানোর পথ সুগম হয়। অনেক পথশিশুর ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন নেই, ফলে তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে ‘জন্মনিবন্ধন ক্যাম্পেইন’, পরিচয়পত্র তৈরি এবং নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে- এটি ঘরে ফিরিয়ে আনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ঘরে ফেরানো মানে শুধু বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া নয়; প্রথমেই দরকার এমন একটি অবকাঠামো যেখানে শিশু নিরাপদভাবে থাকতে পারে, পরে শিক্ষা ও দক্ষতাণ্ডপ্রশিক্ষণ পায়। নন-ফর্মাল শিক্ষা, সামাজিক ও মানসিক সাপোর্ট, স্কিল বেইসড ট্রেনিং দেওয়া জরুরি, কেননা রাস্তায় থাকা শিশুদের বেশিরভাগই পড়াশোনা থেকে বাদ পড়েছে। তাদের ঘরে ফেরিয়ে দেওয়া মানে হলো তাদের ‘অদৃশ্য’ থেকে ‘দৃশ্য’ অবস্থায় আনিয়ে দেওয়া।
একক সংস্থা বা একক প্রকল্প দিয়ে এই পুরো কাজ সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় দপ্তর যেমন সমাজসেবা, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন-উপজেলা দপ্তর, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। শিশু সংক্রান্ত আইননীতি যেমন- ঈযরষফৎবহ অপঃ, ২০১৩, শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণ নীতি কার্যকর করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ‘স্ট্রিট চিল্ড্রেন টাস্ক ফোর্স’ গঠন সম্ভব। এমন উদ্যোগ ঘরে ফেরানোর প্রক্রিয়াকে সুসংহত ও টেকসই করে তুলবে।
ঘরে ফেরানোর পরও শিশুটিকে ফের রাস্তায় ফিরে না যেতে শুদ্ধিকরণ ও মনোবল বৃদ্ধিই সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। পরিবার-সাপোর্ট, নিয়মিত মনোরোগ বা সামাজিক সহায়তা, অভিভাবক ট্রেনিং, শিশু-বন্ধু পরিবেশ যেমন স্কুল বা কমিউনিটি সেন্টার নিশ্চিত হলে এই উদ্যোগ সফল হবে। যদি এই শিশুদের পুরো সক্ষমতায় শিক্ষা ও দক্ষতা দেওয়া হয়, তাহলে তারা দেশের মানবসম্পদ হিসেবে ভূমিকা নিতে সক্ষম হবে। এখন ও ভবিষ্যতে দেশে কাজের চাহিদা রয়ে যাবে। যদি আমরা রাস্তায় থাকা শিশুকে পড়াশোনা, স্কিল ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত পর্যায়ে নিয়ে আসি, তাহলে তারা উৎপাদন, উদ্ভাবন ও সেবা-সেক্টরে অবদান রাখতে পারবে। একদিক দিয়ে দেশ উন্নয়নের জন্য ভালো কর্মক্ষম মানুষ পাবে। রাস্তায় থাকা শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যব্যয়, অপরাধবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা-ব্যয় বেশি হয়। যদি ঘরে ফেরিয়ে দেওয়া হয়, তারা শিক্ষা ও উপার্জনক্ষম হয়, তাহলে দারিদ্র্যের ঝুঁকি কমে যাবে, সামাজিক ব্যয় হ্রাস পাবে।
শিক্ষিত ও দক্ষ নতুন প্রজন্ম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে এবং এর সঙ্গে রাস্তায় থাকা শিশুদের জীবনের সম্ভাবনাও অর্জিত হয়। প্রকৃত অর্থে, তারা শুধু এক সামাজিক ব্যর্থতা নয়—তারা উন্নয়নের অব্যবহৃত সম্ভাবনা। যদি আমরা তাদের ঘরে ফেরাতে পারি, শিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলতে পারি, তাহলে তারা শুধু নিজের জীবনের পরিবর্তন ঘটাবে না; দেশের উন্নয়নে এক বিশাল ভূমিকা রাখবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, সরকারের প্রচেষ্টা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত- এই তিনটির মিশ্রণে পথশিশুরা হয়ে উঠতে পারে, একটা শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই আজই পরিকল্পিত, সমন্বিত ও মানবিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
নাজিয়াত আক্তার
ফিচার, কলাম অ্যান্ড কনটেন্ট রাইটার্স