ঢাকা শনিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইলম আহরণে শিক্ষকের সাহচর্য

মীযান মুহাম্মদ হাসান
ইলম আহরণে শিক্ষকের সাহচর্য

সাহচর্য গ্রহণ ও সান্নিধ্য লাভ ছিল এক চিরাচরিত প্রথা। পবিত্র কোরআনে সুরা কাহফে আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) কর্তৃক হজরত খিজির (আ.)-এর সান্নিধ্য বা শিষ্যত্ব গ্রহণের উপমা উপস্থান করেছেন। যার থেকে বোঝা যায়, একজন উস্তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা জরুরি। একসময় কি ইহজাগতিক আর কি পরলৌকিক শিক্ষা, উভয় ক্ষেত্রেই একসময় মানুষ সান্নিধ্য ও সাহচর্য গ্রহণ করতেন। প্রায় সব বিষয়েই কোনো না কোনো উস্তাদ, গুরু ও শায়েখ ইত্যাদি মুরব্বি মেনেই চলতেন। কিন্তু এখনকার সময়ে এই সান্নিধ্য ও সাহচর্য গ্রহণে অবহেলা ও অনীহা বেড়েছে। এখন সহজেই কেউ কাউকে উস্তাদ মানতে রাজি না। নিজেই নিজেকে মহাবিদ্বান, পণ্ডিত, জ্ঞানী ও বিদ্যাসাগর জ্ঞান করেন। মনে করেন, আমার থেকে বড় আর কেউ নেই। এটি যে এক প্রকার অহংকার। যার ফল অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেকেই তা টের পাচ্ছেন না। আবার জ্ঞান করতে পারলেও, যথাসময়ে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে আফসোস করছেন। এজন্য এখনও যারা ইসলামের সঠিক শিক্ষা অর্জন করতে চান।

তারা অবশ্যই বিজ্ঞ, দক্ষ কোনো আলেমের শরণাপন্ন হয়ে ইলম অর্জন করুন। এতে সঠিক ইলম অর্জন হবে। বাস্তবিক অর্থে যোগ্যতা তৈরি হবে। ইলম ও আমলের জন্য ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে শিখতে পারবেন। অন্যথা ভুলভাল শিখে বিপথগামী হবার সম্ভাবনা প্রবল। রয়েছে পথভ্রষ্ট হবার ঝুঁকিও। এজন্য আল্লাহতায়ালা আমাদের ইলম অর্জনের মতো মহাদৌলত লাভের জন্য যোগ্য ও দক্ষ আলেমের সান্নিধ্য ও সাহচর্য গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আজ আমরা দুজন মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব। যারা উস্তাদের দীর্ঘ সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছেন। হয়েছেন প্রসিদ্ধ ও জগদ্বিখ্যাত। আজও যারা গোটা পৃথিবীতে স্মরণীয় এবং বরণীয়। পরম মানিত ইলমি ব্যক্তিত্ব। তারা হলেন, ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) এবং তারই ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)।

আরবের একজন খ্যাতনামা আলেম, শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) তার কী-মাতুজ জামান ইনদাল ওলামাতে লিখেছেন, ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) সম্পর্কে। যিনি ছিলেন ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) খাস শাগরিদ বা বিশেষ ছাত্র। ছিলেন ফিকহি বোর্ডের সদস্যও। আবার ছিলেন একসময় প্রধান বিচারপতিও। তিনি সতের বছর, আরেক বর্ণনায় ২৯ বছর ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সাহচর্যে কাটিয়েছেন। তার থেকে ইলম শিখেছেন। ফিকহ শিখেছেন। আর এভাবেই তিনি হয়েছেন প্রসিদ্ধ জগদ্বিখ্যাত আলেমদের একজন। ইলম অন্বেষণের প্রতি তার এত বেশি আগ্রহ ও একাগ্রতা ছিল যে, একবার তার এক সন্তান মারা গেলে, তিনি শুধু জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। দাফন কাজে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। শুধু ইলম অর্জন করার সুযোগ হাত ছাড়া হওয়ার আশঙ্কায়।

আর তার উস্তাদ মহান ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কেমন ছিলেন? এটি আজ কারও কাছে অজানা নয়। যার সম্পর্কে বলা, ইমামে আজম। তারিখে বাগদাদে এসেছে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তার উস্তাদ হাম্মাদ ইবনে আবু সুলাইমানের সান্নিধ্যে ছিলেন দীর্ঘ দশ বছর।

একবার ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আলাদা কোনো এক দীনি মজলিস গঠনের ইচ্ছা পোষণ করলেন। ঘটনাক্রমে তার উস্তাদের এক আত্মীয় মারা গেলে, তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। উস্তাদ দুই মাস আত্মীয় বাড়িতে ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন। তখন ওই মজলিসে নতুন নতুন প্রশ্ন আসতে শুরু হলো। যেগুলোর উত্তরও আমি আমার উস্তাদ হাম্মাদ (রহ.) থেকে কখনও শুনিনি। তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন ৬০টি প্রশ্নের উত্তর আমি তাকে দেখালাম। তিনি বিশটিতেই দ্বিমত পোষণ করেন। এরপর আমি সংকল্প করলাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার সান্নিধ্যেই থাকব।

এই ছিল দুজন উস্তাদ শাগরেদের সান্নিধ্য গ্রহণের উপমা। যার ফলে আজ তারা গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর মাঝে পরিচিত, সমাদৃত ও স্বীকৃত। আল্লাহতায়ালা তাদের মাধ্যমে চর্চিত ইলম দ্বারা আমাদেরকে আজও উপকৃত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। এজন্য আজও আমরা তাদেরকে স্মরণ করি। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণালব্ধ মাসআলার ওপর আমল করা হচ্ছে। উম্মতের বৃহৎ অংশ তাদের গ্রহণযোগ্য এবং চূড়ান্ত ফিকহি সিদ্ধান্তকে মেনে চলছে আজও।

উপর্যুক্ত ঘটনা দুটো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট বুঝে আসে, তা হলো একজন বিজ্ঞ উস্তাদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য গ্রহণ করা জরুরি। নয়ত যে কোনো সময় পথভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ইলম অর্জন করার জন্য উস্তাদ হিসেবে কাউকে গ্রহণ করাও জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অন্যথা, শুধু বই পুস্তক পড়ে বা নিজের পড়াশোনার অভিজ্ঞতার আলোকেই সবকিছু শেখা যায় না। বলা যায় না। কিংবা যাচ্ছেতাই বলা উচিত নয়! এতে বিপথগামী হবার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা, এভাবে কুরআন হাদিসের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যায় না। প্রয়োজন হয় একজন উস্তাদের। যিনি সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানে সক্ষম। তাই একজন না একজনকে শিক্ষক হিসেবে মান্য করেই, কোরআন-হাদিস শেখা উচিত। বলা উচিত কোনো শাস্ত্রীয় কথা। বিশেষ করে মাসয়ালা ও ফাতওয়া। নয়ত সমূহ ভুল হবে এবং ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি হবে। এজন্যই সকল কাজেই অভিজ্ঞ কারও না কারও সান্নিধ্য গ্রহণ করা জরুরি।

লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত