প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানো আমাদের চিরচেনা সংস্কৃতি। কিন্তু এই আদিম প্রথাটি এখন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অনেক জায়গায় খড়কুটোর বদলে প্লাস্টিক, পলিথিন, রাবার কিংবা চাকার টায়ার পোড়ানো হচ্ছে। আমরা অবলীলায় আগুনের তাপ নিচ্ছি কিন্তু টেরই পাচ্ছি না আমাদের শরীর কতটা বিষাক্ত হয়ে উঠছে। প্লাস্টিক বা রাবার পুড়লে ডাইঅক্সিন, ফুরান এবং সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয়।
এই গ্যাসগুলো বাতাসের সঙ্গে মিশে সরাসরি আমাদের রক্তে প্রবেশ করে। আগুনের পাশে বসে থাকা মানুষগুলো যখন নিঃশ্বাস নেন, তখন তারা আসলে বিষ গ্রহণ করছেন। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি ডেকে আনে। পারিবারিক আবহে এই আগুনের ব্যবহার আরও বেশি বিপজ্জনক। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের তুলনায় অনেক কম থাকে। বিষাক্ত ধোঁয়া তাদের ছোট ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। অনেক সময় দেখা যায়, আগুনের এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিস জটিল আকার ধারণ করছে। অন্যদিকে বয়স্করা আগে থেকেই বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগেন। রাবার পোড়ানো ধোঁয়া তাদের হাঁপানি বা হার্টের সমস্যাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা যখন এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন, তখন অনাগত সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি শুধু আজকের প্রজন্ম নয়, আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ওপরও বড় আঘাত। শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ভয়ংকর দিকটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্লাস্টিক বা সিনথেটিক পণ্য যখন পোড়ানো হয়, তখন তা গলে তরল আগুনের মতো ঝরতে থাকে। আগুনের পাশে বসা কারো গায়ে এই তরল লাগলে তা চামড়ার গভীরে ঢুকে যায়। সাধারণ কাঠের আগুনের ক্ষত আর প্লাস্টিকের আগুনের ক্ষত এক নয়। প্লাস্টিক পোড়া ক্ষত দ্রুত পচন ধরে এবং অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গহানি পর্যন্ত হতে পারে। বাড়ির ছোট সদস্যরা খেলার ছলে এই আগুনের খুব কাছে চলে যায়। অসাবধানতায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো পরিবারের জীবনে নেমে আসে চরম বিষাদ। শীতের সাময়িক আরামের জন্য আমরা আমাদের প্রিয়জনদের এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আবার, যেখানে এই ক্ষতিকর বর্জ্য পোড়ানো হয়, সেখানকার মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশে যায়। এতে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং ক্ষুদ্র অণুজীব মারা যায়। ফলে সেই স্থানে আর কোনো গাছপালা ঠিকমতো জন্মাতে পারে না। এটি একটি নীরব স্থায়ী ক্ষতি। আমরা হয়তো আগুন পোহানো শেষে উঠে চলে যাই, কিন্তু সেই বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ বছরের পর বছর প্রকৃতিতে থেকে যায়। আগুনের এই ধ্বংসাত্মক ব্যবহার আমাদের সচেতনতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। নিরাপদ শীত যাপনের জন্য আমাদের অভ্যাসে বদল আনা জরুরি। প্লাস্টিক বা রাবার পুড়িয়ে আগুন পোহানো কোনোভাবেই শীত নিবারণের সঠিক উপায় হতে পারে না। আমরা যদি সচেতন না হই, তবে এই আগুনের ওম আমাদের পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে থাকবে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের ঘরের ভেতরে ও বাইরে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। শরীর গরম রাখতে বাড়তি কাপড়ের ব্যবহার এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ অনেক বেশি কার্যকর। আগুনের এই কৃত্রিম উষ্ণতা আমাদের স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। সচেতনতাই পারে আমাদের পরিবারকে এই বিষাক্ত দহন থেকে রক্ষা করতে।
ইব্রাহীম খলিল (সবুজ)
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট