ঢাকা বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পর্যটন থেকে কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থের শক্তিশালী অর্জন

এম মহাসিন মিয়া
পর্যটন থেকে কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থের শক্তিশালী অর্জন

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত; কিন্তু অপরিষ্কৃত প্রাকৃতিক সম্পদের গহ্বর। পাহাড়, সবুজ বনভূমি, ঝরনা, হ্রদ, নদী ও বৈচিত্র্যময় জনজাতি সংস্কৃতি মিলিয়ে এই অঞ্চলের সৌন্দর্য এক অনন্য দৃষ্টিনন্দন অভিজ্ঞতা দেয়। শুধুমাত্র ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্যও পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্প এক বিশাল সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্প সীমিত মাত্রায় বিকশিত। যদিও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার কিছু অংশে পর্যটনকেন্দ্র, হ্রদ এবং পাহাড়ি পর্যটন এলাকায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তবু এখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব দেখা যায়। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলে এটি শুধু দেশের পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করবে না, স্থানীয় তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানেরও নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ : পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। এখানকার হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, যারা এখনও কর্মহীন, তারা পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে। হোটেল, রিসোর্ট, গাইড সার্ভিস, স্থানীয় হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- এই সব ক্ষেত্রেই তরুণরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনায় স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে তারা শুধু আয়ের সুযোগ পাবেন না, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞানকেও কাজে লাগাতে পারবে। এছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে হোমস্টে প্রকল্প ও কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ সরাসরি পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে না, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারার সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিকল্পিত ও আধুনিক যুগোপযোগী উদ্যোগের প্রয়োজন : পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ। এটি শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক বা বিনোদনমূলক উদ্যোগ নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। প্রথমত, পর্যটনকেন্দ্র ও হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ট্রেকিং পথ এবং দর্শনীয় স্থানগুলোর উন্নয়নে সরকারের অর্থায়ন ও প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ উভয়ই অপরিহার্য। যেখানে অবকাঠামো উন্নত হবে, সেখানে পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও বিস্তৃত হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও সেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকরা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্যও ভ্রমণ করতে আগ্রহী। স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যদি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তাহলে দেশের ভেতর ও বাইরে পর্যটকের আগমন আরও বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয়দের পর্যটনশিল্পের জন্য প্রস্তুত করা জরুরি। হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ভাষা প্রশিক্ষণ, গাইড সার্ভিস, হ্যান্ডিক্রাফট উৎপাদন, ইকো-ট্যুরিজম পরিচালনা- এই সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে স্থানীয় তরুণরা শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে না, বরং নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পারবে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা : পর্যটন শিল্পের প্রসার শুধু কর্মসংস্থান নয়, দেশের রাজস্ব আয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিদেশি পর্যটক আগমনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় এবং স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো থেকে সরকারের কর ও সুবিধা অর্জিত হয়। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন খাত- পরিবহন, হোটেল, হস্তশিল্প, খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- সক্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিকভাবেও পর্যটনশিল্প স্থানীয় জনসংখ্যার মানসিক ও সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক। পর্যটকরা স্থানীয় সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করলে স্থানীয়রা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গর্ববোধ অনুভব করবে। এটি সমাজে সম্মিলিত উদ্যোগ, সম্প্রদায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতেও সহায়ক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ সম্ভাবনা : পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্পদ। বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চল, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, খাগড়াছড়ির ঝরনা ও বনভূমি- এই সব মিলিয়ে পর্যটকের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। তাছাড়া, এখানকার বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, গান, নৃত্য ও হস্তশিল্প পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এই সংমিশ্রণ পর্যটনশিল্পকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পর্যটন নীতি, সরকারী সহায়তা, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং আধুনিক যুগোপযোগী অবকাঠামোর উন্নয়ন।

সমস্যাগুলো এবং সমাধানের পথ : যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন সম্ভাবনা অনেক, তবু কিছু বাধা রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ রাস্তা, পর্যাপ্ত হোটেল ও রিসোর্টের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণহীন কর্মী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যটন সচেতনতার অভাব- এই সবই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি পর্যটন নীতি বাস্তবায়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতা- এই ধরনের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করলে সমস্যাগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

আন্তজার্তিক পর্যটন মানদ-ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো : বর্তমান যুগে পর্যটকরা শুধু সৌন্দর্য নয়, আরামদায়ক পরিবেশ, সেবা মান, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার মানদ-ও বিবেচনা করে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। রিসোর্ট, হোটেল, হোমস্টে, ট্রেকিং, রাফটিং, ইকো-ট্যুরিজম- এই সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখা হলে বিদেশি পর্যটকের আগমন আরও বৃদ্ধি পাবে। সবমিলিয়ে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়- সঠিক পরিকল্পনা ও যুগোপযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটনশিল্প। এটি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হাতিয়ার নয়, স্থানীয় তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নয়, বেসরকারি খাতের সহায়তা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য।

পর্যটনশিল্পকে কাজে লাগালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু দেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে সক্ষম হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো, যাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষিত থাকে, স্থানীয় জনগণ সমৃদ্ধ হয় এবং দেশ লাভবান হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, হ্রদ, বনভূমি এবং বৈচিত্র্যময় জনজাতি সংস্কৃতি- এই সবকিছুকে যদি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে আমাদের দেশের পর্যটনশিল্প এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। সময় এসেছে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর, পরিকল্পনা করার এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত