প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
শ্রীকান্ত বোল্লা শুধু একটি নাম নয়, এক বিস্ময়। তিনি একাধারে একজন সামাজিক উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তিবিদ এবং বোল্লান্ট ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। হয়তো ভাবছেন, এতে আবার অবাক হওয়ার কী আছে! আছে, কারণ তিনি আর দশজনের মতো দৃষ্টিময় জগতের বাসিন্দা নন। হ্যাঁ, দৃষ্টিহীন হয়েও শ্রীকান্ত বোল্লা একজন ইঞ্জিনিয়ার ও একজন সফল শিল্পপতি।
তিনি বিশ্ববিখ্যাত ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (এমআইটি)-এর স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ‘ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স’ বিভাগে অধ্যয়ন করা প্রথম আন্তর্জাতিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছানো একদিকে যেমন তার ব্যতিক্রমী মানসিক দৃঢ়তাকে প্রমাণ করে, অন্যদিকে আমাদের এই শিক্ষা দেয় মানুষের ইচ্ছাশক্তির সামনে কোনো বাধাই স্থায়ী নয়। ২০১৭ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন এশিয়া জুড়ে ‘৩০ বছরের কম বয়সি ৩০ জন উদীয়মান উদ্যোক্তা’র তালিকা প্রকাশ করে, সে তালিকায় জায়গা করে নেন শ্রীকান্ত। অবাক করা বিষয় তালিকায় স্থান পাওয়া মাত্র তিনজন ভারতীয়র মধ্যে তিনি একজন।
বর্তমানে শ্রীকান্ত বোল্লার নেট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি রুপি। তবে ভারতের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বস্টনের এমআইটি জয়, বোল্লান্ট ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা এবং মিলিয়নার তালিকায় নাম লেখানো কোনোটিই সহজ ছিল না। দৃষ্টিহীনতার কারণে তাকে পদে পদে বহু লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু শ্রীকান্ত তার মেধা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে সেসব প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা ও অনুপ্রেরণার প্রতীকে।
শ্রীকান্ত বোল্লার জীবনসংগ্রাম ও ঈর্ষণীয় সাফল্য আজ পৃথিবীর লাখ লাখ প্রতিবন্ধী ও পিছিয়েপড়া মানুষদের কাছে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তিনি শুধু একজন সিইও নন; বরং হতাশা ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করা প্রতিটি মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণা ও সাহসের নাম। শ্রীকান্তের জীবনী তাই শুধু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার গল্প নয়; বরং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি সমাজের বৈষম্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। তিনি তার সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন সহানুভূতি নয়, যথাযথ সুযোগ ও পরিবেশ পেলে তারাও সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম।
১৯৯১ সালের ৭ই জুলাই অন্ধ্রপ্রদেশের মাসুলিপত্তনমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম সীতারামপুরমে বিস্ময় বালক শ্রীকান্তের জন্ম। শ্রীকান্তের জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত করুণ। তার বাবা-মা ছিলেন ভূমিহীন কৃষক। শ্রীকান্তের জন্মের পর তার পিতা দামোদর রাও ভেবেছিলেন, তার ছেলে হবে তার নয়নের মণি। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন সেই নয়নের মণির দৃষ্টিই নেই, তখন তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। আত্মীয়-স্বজনরাও পেছনে কটু কথা বলতে শুরু করে। অনেকে শিশুটিকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার মতো ঘৃণ্য পরামর্শও দেয়। কিন্তু শ্রীকান্তের পিতা দামোদর রাও ও মাতা ভেঙ্কটাম্মা সেসব অমানবিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। তারা তাদের সন্তানকে ভালোবাসা ও স্নেহের সাথে বড় করার কঠিন শপথ গ্রহণ করেন। যা শ্রীকান্তের ভবিষ্যত আত্মবিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
শ্রীকান্ত তার জীবনে এমন সব প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন যা খুব কম লোকই মোকাবিলা করতে পারে। ছয় বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রতিদিন কর্দমাক্ত পথ দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেওয়া তার জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। এছাড়া দৃষ্টিহীনতার কারণে স্কুলে তাকে সহপাঠী ও শিক্ষকদের চরম অবহেলার শিকার হতে হয়। তাকে ক্লাসের একদম পেছনের সারিতে বসিয়ে রাখা হতো এবং কোনো সহপাঠী তার সাথে কথা বলতো না। পরবর্তীতে তিনি হায়দ্রাবাদের একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি হন। শ্রীকান্তের জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে দশম শ্রেণির পর। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। তার মেধাও ছিল অত্যন্ত প্রখর। যা তিনি দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় ৯৮% নম্বর পেয়ে প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি একাদশ শ্রেণিতে ‘বিজ্ঞান’ নিয়ে পড়তে চাইলেন, তখন অন্ধ্রপ্রদেশের শিক্ষা বোর্ড তার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, দৃষ্টিহীনদের বিজ্ঞান ও গণিত বিভাগে পড়া নিষিদ্ধ ছিল। কারণ তাদের ধারণা দৃষ্টিহীনরা গ্রাফ-ডায়াগ্রাম, রাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল গাণিতিক হিসাব বুঝতে সক্ষম নয়। তাই দৃষ্টিহীনদের শুধু কলা ও ভাষা বিষয়ক বিভাগে পড়ার অনুমতি ছিল।
শ্রীকান্ত এই নিয়মকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা শুধু তার একার লড়াই নয়। বরং ভারতের লক্ষ লক্ষ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর অধিকারের প্রশ্ন। তার শিক্ষক ও মেন্টর দেবিকা মালভাড়ের সহায়তায় তিনি অন্ধ্রপ্রদেশ শিক্ষা বোর্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই আইনি লড়াই শেষে আদালত শ্রীকান্তের পক্ষে রায় দেয়। এই রায়ের মাধ্যমে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞানের দুয়ার চিরতরে খুলে যায়। তিনি শুধু তার অধিকার আদায় করেননি, বরং দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় আবারও ৯৮% নম্বর পেয়ে প্রমাণ করেন, বিজ্ঞানের জটিল পাঠ তার জন্য আদতে কোনো বাধাই ছিল না।
বিজ্ঞানে অসাধারণ সাফল্য অর্জনের পর শ্রীকান্তের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল ভারতের গৌরব ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (আইআইটি)-তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। তবে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংস্কারহীন মানসিকতা তাকে আবারও বাধার মুখে ফেলে দেয়। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কোচিং সেন্টারগুলো তাকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে আইআইটি তো তাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগই দেয়নি। এই বঞ্চনা শ্রীকান্তকে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে। তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন দেশে তার সৃজনশীলতার প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে না। তখন তিনি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন শুরু করেন। তার মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভর্তির প্রস্তাব দেয়। যার মধ্যে ছিল স্ট্যানফোর্ড, বার্কলে এবং কার্নেগি মেলন। শেষ পর্যন্ত তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে বেছে নেন এবং সেখানে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন এমআইটির ইতিহাসে প্রথম আন্তর্জাতিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সহায়তায় (অর্থাৎ ১০০% স্কলারশিপে) পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
শ্রীকান্তের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণা ছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালাম। ২০০৬ সালে ‘লিড ইন্ডিয়া ২০২০’ নামে একটি সম্মেলনে শ্রীকান্তের সাথে কালামের প্রথম দেখা হয়। ড. কালাম যখন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন তারা ভবিষ্যতে কী হতে চায়। তখন ১৫ বছর বয়সী শ্রীকান্ত উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি ভারতের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাষ্ট্রপতি হতে চাই’। তার এই অকুতোভয় আত্মবিশ্বাস দেখে কালাম অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং তাকে অভিনন্দন জানান। এরপর কালাম ও শ্রীকান্তের মধ্যে এক গভীর মেন্টর-শিক্ষার্থী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শ্রীকান্ত ‘লিড ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের একজন প্রধান ছাত্রনেতা হিসাবে কাজ করেন এবং প্রায় আট লাখ তরুণকে নেতৃত্ব ও কর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানে সহায়তা করেন। কালাম প্রায়ই শ্রীকান্তকে ‘একজন সত্যিকারের হিরো’ হিসাবে উল্লেখ করতেন।
আমেরিকা থেকে ফিরে ব্যবসা শুরুর জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর, শ্রীকান্ত যখন প্রায় হতাশার দ্বারপ্রান্তে। ঠিক তখনই দেবদূতের মতো আবির্ভূত হন ড. কালাম। তিনি শ্রীকান্তের ব্যবসায়িক উদ্যোগে আস্থা রাখেন এবং প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ করেন।
২০১২ সালে এমআইটি থেকে স্নাতক শেষে শ্রীকান্তের সামনে আমেরিকায় বিলাসবহুল জীবনের হাতছানি ছিল। বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি থেকেও তার কাছে লোভনীয় প্রস্তাব আসতে শুরু করে। কিন্তু দেশের প্রতিবন্ধী মানুষদের কথা ভেবে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। তিনি জানতেন ভারতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত নগণ্য। সেই ভাবনা থেকেই তিনি তার বিশ্বস্ত বন্ধু রবি মান্থার সহায়তায় হায়দ্রাবাদে ‘বোল্লান্ট ইন্ডাস্ট্রিজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীকান্ত মনে করেন সহানুভূতি মানুষকে পঙ্গু করে দেয়; কিন্তু সুযোগ মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে। তাই তার কোম্পানির অধিকাংশ কর্মীই বিভিন্ন শারীরিক প্রতিবন্ধী। অথচ তারা সাধারণ কর্মীর মতোই দক্ষতার সাথে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বর্তমানে বোল্লান্ট ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক আয় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং শ্রীকান্তের লক্ষ্য খুব দ্রুতই একে একটি ইউনিকর্ন কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা। এসবের পাশাপাশি তিনি ‘শার্ক ট্যাংক ইন্ডিয়া’-র অন্যতম বিচারক হিসাবে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শ্রীকান্ত বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর ‘ইয়ং গ্লোবাল লিডার ২০২১’ হিসাবে নির্বাচিত হন। জেসিআই ইউএসএ তাকে জেসিআই-এর বিশ্বের সেরা দশজন তরুণ ব্যক্তিত্বের একজন হিসাবে নির্বাচিত করে। এছাড়াও ওয়ান ইয়ং ওয়ার্ল্ড (যুক্তরাজ্য) ২০১৯-এর সেরা উদ্যোক্তা গ্লোব, ইসিএলআইএফ (মালয়েশিয়া) কর্তৃক উদীয়মান নেতৃত্ব পুরষ্কার-২০১৬, সিআইআই কর্তৃক উদীয়মান বর্ষসেরা উদ্যোক্তা-২০১৬, ফিনান্সিয়াল টাইমস ২০১৮-এর উদীয়মান উদ্যোক্তা, ইয়ুথ বিজনেস ইন্টারন্যাশনাল উগান্ডা কর্তৃক সামাজিক উদ্যোক্তা-২০১৬ ইত্যাদি ছাড়াও তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০২৪ সালে শ্রীকান্তের জীবনী অবলম্বনে নির্মিত হয় বলিউড চলচ্চিত্র ‘শ্রীকান্ত’। চলচ্চিত্রটি ‘ব্রেকিং ডাউন ব্যারিয়ারস’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের জন্য ‘গ্র্যান্ড প্রিক্স’ পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া শ্রীকান্তের চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান অভিনেতা ‘রাজকুমার রাও’। পাশাপাশি তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেতা (সমালোচক) এবং এনডিটিভির বর্ষসেরা অভিনেতা হিসাবে নির্বাচিত হন।
সংগীত কুমার
কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়