প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো সমস্যা একদিনে তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে কোনো একটি খাতের ভেতরে যখন পরিকল্পনার ঘাটতি জমতে থাকে, তখন একসময় পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল সব কিছুর ওপরই চাপ বাড়ছে; আর এর প্রতিচ্ছবি দেখা যায় প্রত্যেক পরিবারের রান্নাঘর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।
আজকাল শহরের যে কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বললেই প্রথম যে বিষয়টি শোনা যায় তা হলো বিলটা কেন এত বাড়ল? মানুষ বুঝেই উঠতে পারছে না, গত মাসেও যে বিল ২,০০০ টাকার মধ্যে ছিল, তা হঠাৎ ৩,৫০০ টাকা ছুঁয়ে ফেলল কীভাবে। শুধু বিদ্যুৎ নয় গ্যাস না থাকায় রেস্টুরেন্টগুলোতে রান্নার খরচ বেড়ে গেছে, ব্যয় বাড়ায় সেবামূল্যও বাড়ছে। গাড়ির মালিকদের জন্য জ্বালানির দাম এখন আর ‘মাসিক ব্যয়ের অংশ নয়; বরং একেকটা ট্যাঙ্ক ভরতে গিয়ে মনে হয় বড় কোনো বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
এগুলো শুধু শহরের চিত্র। জেলার ছোট শহর বা গ্রামীণ অঞ্চলে পরিস্থিতি অন্য রকম। সেখানে বিদ্যুতের লোডশেডিং এখনও নিত্যদিনের সঙ্গী। ব্যবসায়ীরা দিনের বেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে দোকান চালাতে পারছেন না, রাতে মানুষ ঘুমাতে পারছে না। কৃষকরা সেচের পাম্প চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর যে কৃষকরা ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করেন, তাদের খরচ বেড়ে গেছে তিনগুণ। এসব চাপের প্রভাব শেষে খাদ্যদ্রব্যের দামেও এসে পড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট শুধু একটি খাত নয় এটি পুরো সমাজের ওপর বহুমাত্রিক একটি চাপ।
অনেকে বলেন, এ সংকট অপ্রতিরোধ্য বিশ্ববাজারে দামের অস্থিরতা আছে, যুদ্ধ আছে, সংকট আছে। ঠিক আছে, সমস্যা বৈশ্বিক; কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের প্রস্তুতি কোথায়? বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমছে, নতুন অনুসন্ধান দরকার। তবুও আমরা আমদানিনির্ভর এলএনজি-র ওপর ভরসা করে গেছি। আর আন্তর্জাতিক বাজার যখন দাম বাড়িয়েছে, তখন আমাদের ওপর চাপ এসে পড়েছে দ্বিগুণ।
আরেকটি বড় চিত্র হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। আমরা বিপুল সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছি, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই। এতে হয়েছে কী ক্ষমতা আছে, কিন্তু চালানোর মতো জ্বালানি নেই। ফলে ‘ক্ষমতা চার্জ’ দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ বানাতে না পারলেও পাওয়ার প্ল্যান্টকে টাকা দিতে হচ্ছে। এসব অদৃশ্য ক্ষতি গিয়ে জমছে ভোক্তার বিলের ওপর।
দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা সবসময় নীরব থাকে তাদের ওপর চাপটি সবচেয়ে বেশি। আয় বাড়ছে না, অথচ খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাসাভাড়া, বাজার খরচ, বিদ্যুৎ বিল, স্কুলের ফি সবই একসঙ্গে বাড়তে থাকায় তাদের জীবনধারা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে গ্যাসচুলা থেকে ইন্ডাকশন বা বৈদ্যুতিক চুলায় যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানেও তো বিদ্যুতের বিল বাড়ছে।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। অফিস থেকে ফেরার পরে গরমের চাপে এয়ারকন্ডিশনার চালাতে হয়, কিন্তু বিল আসে অতিরিক্ত। ফ্রিজ, ফ্যান, ওয়াশিং মেশিন এসব তো বাদ দেওয়া যায় না। ফলে মাস শেষে হিসাব মিলাতে গিয়ে টান পড়ে। শুধু শহরে নয় গ্রামেও ডিজেলচালিত সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন-খরচ বেড়ে গেছে; তার প্রভাব বাজারে পণ্যের দামের মধ্য দিয়ে শহরের মানুষকেও সহ্য করতে হচ্ছে।
আমরা প্রায়ই শুনি টেকসই সমাধান দরকার কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই টেকসই সমাধানগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে কী কী প্রয়োজন? বাংলাদেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা বিশাল। ছাদভিত্তিক সোলার সিস্টেম থেকে শুরু করে সোলার ফার্ম সব জায়গায়ই কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। কর রেয়াত, সহজ লোন, নেট মিটারিং এসব প্রকল্প আরও কার্যকর করতে হবে। বিশেষ করে শহরের ভবনগুলোতে সোলার বাধ্যতামূলক করা হলে বিদ্যুতের ওপর চাপ অনেক কমে যাবে।
নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান শুধু জরুরি নয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেল-গ্যাসের দাম যেভাবে ওঠাণ্ডনামা করে, আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকা মানে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকা। নতুন কেন্দ্র নির্মাণের আগে প্রয়োজন জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করা। প্রয়োজনহীন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা, এবং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। ঢাকা শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যরে একটি অংশ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা বহু দেশ করছে। আমাদেরও এখানে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। এখানে ভোক্তাকে দোষারোপ করা নয়; বরং সচেতনতা বাড়ানো দরকার। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা, পুরনো যন্ত্রপাতি এসব জিনিস পরিবর্তন করলে অনেক খরচ কমানো যায়। তবে এটিও ঠিক ভোক্তার পরিবর্তনের চেয়ে রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনের প্রভাব অনেক বেশি।
জ্বালানি সংকটকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে আমরা সংকুচিত হবো। বরং এটিকে ভবিষ্যতে টেকসই, নিরাপদ ও স্বনির্ভর জ্বালানি নীতি তৈরির সুযোগ হিসেবেও দেখা যায়। দেশ উন্নত হবে এটা ঠিক, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন দুর্বল ভিত্তির ওপর না দাঁড়ায়। একটি দেশের শক্তি-নিরাপত্তা মানে শুধু বিদ্যুৎ থাকা নয়; এর মানে হলো ভোক্তার ওপর অযৌক্তিক চাপ না থাকা। বাজার স্থিতিশীল থাকা। শিল্পোৎপাদন বাধাহীন থাকা। কৃষক যেন বাড়তি খরচে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর কম নির্ভরতা। এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করার একটাই পথ টেকসই শক্তিনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একদিনে তৈরি হয়নি; তাই একদিনে সমাধানও হবে না। কিন্তু আজ যদি দৃঢ় নীতি, সঠিক বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, তাহলে আগামী দশকেই বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বদলে যেতে পারে। আমাদের ভোক্তারা চাপের মধ্যে আছে তারা শান্তি চায়, স্থিতিশীলতা চায়। আর সেই স্থিতিশীলতা তখনই আসবে, যখন জ্বালানি খাতকে আমরা তাৎক্ষণিক সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা-ভাবনার আলোকে পরিচালিত করব।
সংকট এখনই আছে কিন্তু এর ভেতরেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে। শুধু প্রয়োজন, সেই সম্ভাবনাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ