প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
বর্তমানে আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ডেঙ্গু’। এক সময় একে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এডিস মশার ধরন বদলানোর ফলে এখন বছরজুড়েই এর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। দিন দিন ডেঙ্গু পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটছে, তা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU)-সবখানেই এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের আর্তনাদ। এই ভয়াবহতা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এখন সময়ের দাবি।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের মরণকামড় অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আগে ধারণা করা হতো এডিস মশা শুধু দিনের বেলা কামড়ায়, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে এই মশা কৃত্রিম আলোতেও সক্রিয় থাকে। ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি এখন চব্বিশ ঘণ্টায় বিস্তৃত।
এছাড়া ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনেও (Serotype) পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা একবার আক্রান্ত হয়েছেন, তারা দ্বিতীয়বার ভিন্ন কোনো ধরনে আক্রান্ত হলে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’ বা ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে’ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকছে। রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং দ্রুত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ফলে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা দায়ী। সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো মশা নিধনে যে ওষুধ ব্যবহার করে, অনেক ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মশার ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও অপ্রতুল। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য, টায়ার ও ডাবের খোসা ফেলে রাখার ফলে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়ছে। নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে জমে থাকা পানি মশার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীর চাপে ন্যুব্জ। সাধারণ শয্যা ও আইসিইউর সংকট চিকিৎসা সেবাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকার রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরমুখী হতে হচ্ছে, যা অনেক সময় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। সরকার বা প্রশাসন একা এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না যদি না সাধারণ মানুষ সচেতন হয়।
নিজেদের নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাত্র এক চা চামচ জমা পানিতেও এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। ফ্রিজের ট্রে, এসির পানি, ফুলের টব বা ড্রাম যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত সুরক্ষা : দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের শরীর ঢেকে থাকে এমন পোশাক পরানো উচিত। ৩. ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ : জ্বর হলেই সাধারণ ভাইরাল ফিভার মনে করে বসে থাকা চলবে না। এখনকার পরিস্থিতিতে জ্বরের প্রথম দিনেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1) করা জরুরি। মশা নিধন কার্যক্রমকে শুধু ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিজ্ঞানভিত্তিক ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ (IVM) পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সারা বছর ধরে মশার প্রজনন স্থল ধ্বংস করার অভিযান সচল রাখতে হবে। যেসব ভবন মালিকের অবহেলার কারণে মশা জন্মায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসার মানোন্নয়ন করতে হবে যাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান।
ডেঙ্গু কোনো অপ্রতিরোধ্য মহামারি নয়; সঠিক পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হাসপাতালের বেডে কোনো স্বজনের মৃত্যু দেখা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের উদাসীনতা ত্যাগ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার বাড়ির কোণে জমে থাকা সামান্য স্বচ্ছ পানিই হতে পারে ডেঙ্গুর উৎস। আজই সচেতন না হলে এই ভয়াবহতা আগামীতে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।