প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশে আইন নেই এই কথাটি শুনতে যতটা সত্য বলে মনে হয়, বাস্তবে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমাদের সমস্যা আইন না থাকার নয়, আমাদের সমস্যা আইন কার্যকর না হওয়ার। সংবিধান আছে, ফৌজদারি দণ্ডবিধি আছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আছে, ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত আছে। তবু প্রতিদিন খুন হয়, ধর্ষণ হয়, গুম হয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের খবর আসে আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার হয় না। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ‘আইন আছে, বিচার নেই’ কথাটি আর কোনো আবেগী স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও নির্মম সংজ্ঞা।
ওসমান হাদী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন প্রায় ১ মাস হতে চলল। একটি মানুষের মৃত্যু রাষ্ট্রের যন্ত্রকে যে নড়াচড়া করানোর কথা ছিল, তার লেশমাত্রও দেখা যায়নি। নেই কোনো দৃশ্যমান বিচারিক তৎপরতা, নেই কোনো উদ্বেগ, নেই কোনো দায়বদ্ধতার প্রকাশ। এই বিচার না হওয়া শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকেত। এটি জানিয়ে দেয় এই দেশে একজন মানুষের জীবন রাষ্ট্রের কাছে কতটা তুচ্ছ। এই নীরবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিচারব্যবস্থা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমি কেউই নিরাপদ নই।
এই বিচারহীনতার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি আমরা দেখি ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কখনও বাসে, কখনও বাড়িতে, কখনও স্কুলে, কখনও রাস্তার পাশে। সংবাদে আসে, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে সব হারিয়ে যায়। বিচার হয় না, বা হলেও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ধর্ষণ এখানে শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার সবচেয়ে নগ্ন প্রদর্শনী। সম্প্রতি সাভার-আশুলিয়া রুটে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীকে রাতভর আটকে রেখে গণধর্ষণের ঘটনা তারই প্রমাণ। কয়েকজন গ্রেপ্তার, কিছু সংবাদ, কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ এরপর সব চুপ। প্রশ্ন ওঠে না, কীভাবে একটি বাস রাতভর ঘুরে বেড়াল? কেন কোনো পর্যায়ে হস্তক্ষেপ হলো না? কীভাবে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত দায় নিয়ে আলোচনা হয় না? ধর্ষণ এখানে আর ব্যতিক্রম নয়; এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনার পরও সমাজের একটি বড় অংশ প্রশ্ন তোলে ‘এত রাতে মেয়েটির বাইরে যাওয়ার কী দরকার ছিল?’ এই প্রশ্নই প্রমাণ করে, ধর্ষণের দায় অপরাধীর নয়, সমাজ সেটি চাপাতে চায় ভুক্তভোগীর ওপর। একজন পুরুষ রাতে বাইরে থাকলে কোনো প্রশ্ন ওঠে না, কিন্তু একজন নারী হলে তার সময়, পোশাক, চলাফেরা, চরিত্র সবকিছু নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এই ভিকটিম-ব্লেমিং সংস্কৃতি ধর্ষকদের সবচেয়ে বড় ঢাল।
বিচারহীনতার এই নীরবতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি Institutional Failure। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Douglass North Zvui Institutional Failure Model -এ দেখিয়েছেন, দুর্বল ও প্রভাবাধীন প্রতিষ্ঠান কখনও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার যদি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে পারে, তবে ধর্ষণের মতো অপরাধেও সত্য চাপা পড়ে যায়। বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বড় অংশই তদন্ত পর্যায়েই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, ধর্ষণের বিচার না হওয়ার পেছনে সরকারের সরাসরি অনিচ্ছাই দায়ী। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। এখানে একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম কাজ করে পুলিশ, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক, প্রসিকিউশন, আইনজীবী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাব। প্রত্যেক স্তরেই এমন মানুষ বসে আছেন, যাদের কাছে ন্যায়বিচারের চেয়ে নিজের সুবিধা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধও দরকষাকষির বিষয়ে পরিণত হয়।
Max Weber-Gi Neo-Patrimonialism Model আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন ধর্ষণের বিচার হয় না। এখানে আইনের চেয়ে পরিচয় ও ক্ষমতা বেশি কার্যকর। অভিযুক্ত যদি প্রভাবশালী হয়, মামলার গতি থেমে যায়। ভুক্তভোগী যদি দরিদ্র হয়, মামলা দুর্বল হয়। ফলে ধর্ষণের বিচারনির্ভর করে অপরাধের ভয়াবহতার ওপর নয়, বরং কে অপরাধ করেছে এবং কে ভুক্তভোগী তার ওপর। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে ওসমান হাদি যদি বিচার না পান, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি যদি বিচার না পায়, তবে আমি কে, আপনি কে? আমাদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না থাকাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
Elite Capture Theory ব্যাখ্যা করে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে একটি ক্ষুদ্র এলিট শ্রেণির দখলে চলে যায়। তখন আইন সাধারণ মানুষের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলোতে এটি সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রভাবশালীদের সন্তানেরা পার পেয়ে যায়, আর সাধারণ পরিবারের মেয়েরা ন্যায়বিচারের আশায় বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়ায়। বিশ্বব্যাংকের Bad Governance Model বলছে, যখন জবাবদিহিতা ও Rule of Lwa ভেঙে পড়ে, তখন ধর্ষণ ও সহিংসতার মতো অপরাধ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে আজ ধর্ষণ আর সামাজিকভাবে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়; এটি নিয়মিত সংবাদ। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে ভয়ংকর। এই বিচারহীনতার সামাজিক প্রভাব গভীর। মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়। ধর্ষণের শিকার পরিবার বিচার না পেয়ে ভেঙে পড়ে, অনেক সময় চুপ থাকতে বাধ্য হয়। অপরাধীরা সাহস পায়, কারণ তারা জানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু হবে না। এইভাবেই ধর্ষণ একটি সামাজিক মহামারিতে রূপ নেয়।
অনেকে বলেন, দেশে বিপ্লব দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দেশে বিপ্লব নয়, বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার দরকার। ব্যক্তি বদলালেও যদি কাঠামো বদলায় না, তবে ধর্ষণ, খুন, গুম সবই চলতে থাকবে। সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো এই দেশে ইনসাফ চাইতে গেলে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তাই অনেকেই নীরব থাকে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য এখানে ভয়াবহ। ফলে ধর্ষণের শিকার পরিবারগুলোও অনেক সময় চুপ করে যায়। যতদিন এই দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক না হবে, ততদিন ধর্ষণ বন্ধ হবে না, গুম-খুন বন্ধ হবে না, মৃত্যুর মিছিল ছোট হবে না। গোরস্থানের দূর্বাঘাস সবুজই থাকবে, কারণ তা পুষ্ট হয় বিচারহীনতার রক্তে। এই হলো আমাদের তথাকথিত সৌভাগ্য আইন আছে; কিন্তু বিচার নেই।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়