ঢাকা সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নারী অভিবাসনের ছন্দপতন শ্রমবাজারের সংকট ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

রাকিবুল ইসলাম
নারী অভিবাসনের ছন্দপতন শ্রমবাজারের সংকট ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মজবুত ভিত্তি হলো প্রবাসী রেমিট্যান্স। যার একটি বিশাল অংশ আসে নারী অভিবাসীদের হাত ধরে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী অভিবাসনের পরিসংখ্যানে যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়ন উভয় ক্ষেত্রেই একটি বড় ধরনের সতর্কসংকেত। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি নারী কর্মী কাজের সন্ধানে বিদেশে গিয়েছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়ায় প্রায় ৬১ হাজারে এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা মাত্র ৬২ হাজারের কোটায় স্থির থাকে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে নারী অভিবাসনের হার হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসের উপাত্ত অনুযায়ী, এই প্রবাহ ৪০ হাজারের নিচে অবস্থান করছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে বহুমুখী ও গভীর কিছু কারণ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, বাংলাদেশের নারী অভিবাসনের প্রায় ৮০ শতাংশই নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর।

বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান এবং লেবাননে নারী গৃহকর্মীদের কর্মপরিবেশের ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। প্রত্যাবাসনকারী নারী কর্মীদের দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (যেমন ব্র্যাক বা রমরু) গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী বিদেশে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক নির্যাতনের শিকার হন।

বেতন বঞ্চনা, পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে বন্দি করে রাখা এবং দীর্ঘ ১৮-২০ ঘণ্টা একটানা কাজ করানোর মতো অমানবিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো যখন গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন সম্ভাব্য অভিবাসী নারী ও তাদের পরিবারের মধ্যে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার চেয়ে দেশেই স্বল্প আয়ে থাকা অনেক পরিবার এখন নিরাপদ মনে করছে, যা এই সংখ্যা হ্রাসের প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের খাপ খাইয়ে নিতে না পারা একটি বড় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় কেয়ারগিভিং, নার্সিং ও হসপিটালিটি সেক্টরে দক্ষ নারীকর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের নারী অভিবাসীদের সিংহভাগই এখনও অদক্ষ ‘হাউসমেড’ বা গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমান।

বিশ্বব্যাংক ও আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন দক্ষ নার্স বা কেয়ারগিভার একজন সাধারণ গৃহকর্মীর তুলনায় অন্তত তিন থেকে চার গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারেন এবং তাদের আইনি সুরক্ষাও অনেক বেশি সুসংহত। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং আইটি-সংক্রান্ত কারিগরি শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় আমরা উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারছি না। ফলে শুধু সংখ্যায় নয়, আয়ের গুণগত মানও কমছে।

নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। গত এক দশকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নারী কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো যুগান্তকারী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। কুয়েত বা লেবাননের মতো পুরোনো বাজারগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এছাড়া কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ তাদের স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে ‘জাতীয়করণ’ নীতি গ্রহণ করায় বিদেশি অদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিবাসন ব্যয়ের উচ্চহার। দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে একজন নারীকে বিদেশ যেতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, অনেকক্ষেত্রে সেই ঋণ পরিশোধ করতেই তার কয়েক বছর লেগে যায়। এ আর্থিক ঝুঁকিও অভিবাসনের হার কমার অন্যতম কারণ।

এ নেতিবাচক প্রবণতা দেশের সামাজিক কাঠামোতেও ধাক্কা দিচ্ছে। নারী অভিবাসন কমলে নারীর ব্যক্তিগত আর্থিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, যা পরোক্ষভাবে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির উচিত এখনই ‘লেবার ডিপ্লোম্যাসি’ বা শ্রম কূটনীতি জোরদার করে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে সুরক্ষা নিশ্চিতকারী নতুন চুক্তি করা। নারীদের শুধু গৃহকর্মী হিসেবে না পাঠিয়ে নার্সিং, কেয়ারগিভিং, আইটি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গার্মেন্টস সেক্টরে দক্ষ করে তোলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করা অপরিহার্য। পাশাপাশি বিদেশফেরত নারীদের সামাজিক ও মানসিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে যাতে তাদের অভিজ্ঞতা অন্যদের নিরুৎসাহিত না করে।

নারী অভিবাসন হ্রাস পাওয়া মানে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলা। এই অন্ধকার চিত্র পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। যদি আমরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে বিশ্ব শ্রমবাজারে বাংলাদেশের এই শক্তিশালী অংশীদারিত্ব অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

রাকিবুল ইসলাম

সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত