ঢাকা রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস : সুস্থ থাকতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সজাগ থাকুন

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস : সুস্থ থাকতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সজাগ থাকুন

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) তার গৌরবময় পথচলার ৭০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে। ১৯৫৬ সালে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের হাত ধরে যে চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল, আজ তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত ‘ডায়াবেটিস সচেতনতা সপ্তাহ’ আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে এক গভীর বার্তার সঞ্চার করে। ডায়াবেটিস শুধু একটি রোগ নয়, এটি একটি জীবনযাপনের সংকট যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক সত্তাকে তিলে তিলে ক্ষয় করে। বাডাসের এই দীর্ঘ পথচলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সংগ্রাম। আজ এই জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক সচেতনতাকে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে একটি ডায়াবেটিস-মুক্ত ও সুস্থ প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের এই ক্ষণটি আমাদের জন্য আত্মোপলব্ধির এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়। সাত দশকের এই সেবামূলক যাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে মহামারি সদৃশ যেকোনো রোগকে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই বিশেষ দিনে বাডাস আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচি শুধু উদ্যাপনের জন্য নয়, বরং এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রতিটি হাসপাতালের প্রাঙ্গণে, প্রতিটি সেবাকেন্দ্রে আজ যখন প্রতিষ্ঠাতার আদর্শ ধ্বনিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানেই জীবনের পরাজয় নয়, বরং নতুন এক শৃঙ্খলার সূচনা। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সেবার মানসিকতা আর বিজ্ঞানের সমন্বয় কীভাবে একটি জাতির জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।

ডায়াবেটিস সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আজ আর শুধু চিকিৎসকের চেম্বারের সীমিত আলোচনার বিষয় নয়, এটি এখন এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যখন একজন মানুষ জানতে পারেন যে তার শরীরে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত, তখন তিনি শুধু একাই বিচলিত হন না, বরং পুরো পরিবার এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

সচেতনতা সপ্তাহ পালনের মাধ্যমে বাডাস এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, ভয় নয়, বরং জ্ঞানের আলোয় এই আঁধার দূর করতে হবে।

ডায়াবেটিস কী, কেন হয় এবং কীভাবে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়- এই প্রাথমিক পাঠগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। সচেতনতা হলো সেই প্রথম পদক্ষেপ, যা মানুষকে অন্ধকারের খাদ থেকে টেনে তুলে আলোর পথে নিয়ে আসে। সুস্থ জীবনধারায় উৎসাহিত করা এই দিবসের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের আধুনিক যান্ত্রিক জীবন আমাদের যেমন গতি দিয়েছে, তেমনি কেড়ে নিয়েছে শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ। ফাস্টফুড আর অলস সময় কাটানো আমাদের শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এমন এক জীবন দর্শনের ওপর, যেখানে শরীরচর্চা আর মানসিক প্রশান্তি হবে দৈনন্দিন রুটিন। সুস্থ থাকা মানে শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়, বরং প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকা। আমরা যদি আমাদের জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনতে পারি, তবে ডায়াবেটিস নামক এই অদৃশ্য শৃঙ্খল থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

একটি ছোট গল্পের কথা মনে পড়ে- শহরের ব্যস্ত চাকুরে আসলাম সাহেব ভাবতেন রোগ শুধু বৃদ্ধদের জন্য। কিন্তু একদিন সামান্য মাথা ঘোরা নিয়ে পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানলেন তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সেই দিন থেকে তিনি হাঁটা শুরু করলেন এবং আজ তিনি তার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে কর্মক্ষম মানুষ। এই ছোট গল্পটি আমাদের শেখায় যে নিয়মিত পরীক্ষা করা কতটা জরুরি। ডায়াবেটিসের অনেক লক্ষণ প্রাথমিক অবায় বোঝা যায় না, তাই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করাই হলো একমাত্র রক্ষা কবচ। বাডাসের স্লোগান অনুযায়ী, ‘জানুন আপনার ডায়াবেটিস আছে কি না’, কারণ গোপন শত্রু সবসময় প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে বেশি ভয়ংকর।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক সচেতনতা থাকলে প্রায় ৭০ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটি শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, বরং একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে আমাদের দেখতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে ধর্মীয় উপাসনালয় পর্যন্ত- সবখানে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছাতে হবে। সচেতনতা মানেই শুধু জানা নয়, বরং সেই জ্ঞানকে অভ্যাসে পরিণত করা। আমরা যদি আজ সজাগ না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এক রুগ্ন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সঠিক ব্যবস্থাপনার বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাডাস সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ডায়াবেটিস ধরা পড়ার মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল জীবনের শুরু। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নির্ধারিত ওষুধ এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে একজন ডায়াবেটিক রোগীও একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারেন। সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রধান শর্ত হলো চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিজের শরীরের ভাষার প্রতি লক্ষ্য রাখা। ২০২৬ সালের এই সচেতনতা দিবসে বাডাস জোর দিচ্ছে এমন এক সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর যেখানে রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শরীরচর্চার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গেলে কবির সেই পঙক্তি মনে পড়ে: ‘পায়ের তলায় সজীব মাটি, মুক্ত আকাশ মাথে, সুস্থ দেহ সুস্থ মন, হাঁটলে প্রাতের পথে। ‘দিনের অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা ব্যায়াম করা আমাদের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। ব্যায়াম শুধু পেশি গঠন করে না, এটি আমাদের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়। শরীরচর্চাকে বোঝা মনে না করে একে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে এই সচেতনতা সপ্তাহে। একটি কর্মঠ শরীরই পারে ডায়াবেটিসকে দূরে সরিয়ে রাখতে।

স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের বিষয়ে আমাদের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। অনেকে মনে করেন ডায়াবেটিস মানেই সব খাবার বন্ধ, আসলে তা নয়। সুষম খাদ্য বা ব্যালেন্স ডায়েটই হলো এর আসল সমাধান।

চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত লবণ আর চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে আঁশযুক্ত সবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। খাবার হতে হবে পরিমিত এবং সময়মতো। খাবারের মাধ্যমেই আমরা আমাদের শরীরকে জ্বালানি দিই, তাই ভেজাল আর অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করে প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ফিরে যাওয়াই হবে আজকের দিনের শপথ।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই সময়- এই স্লোগানটি আমাদের আলস্য কাটিয়ে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। আমরা প্রায়ই ভাবি যে সচেতনতা কাল থেকে শুরু করব, কিন্তু ডায়াবেটিস আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, বিশেষ করে যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে তাদের জন্য এখনই জীবনযাত্রা পরিবর্তনের সময়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় আপনার ভূমিকা’ আমাদের সরাসরি দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে কাল আমাদের সন্তানরা এই ভুলের মাশুল দেবে।

ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং রোগের সঠিক নির্ণয় নিশ্চিতকরণ এই প্রচারণার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং বংশগত কারণগুলো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করতে ভয় পান, যা জটিলতাকে আরও ঘনীভূত করে। রোগের সঠিক নির্ণয় মানেই অর্ধেক চিকিৎসা। বাডাস সারাদেশে তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভুল পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রোগ লুকিয়ে রাখলে তা শুধু নিজেরই ক্ষতি করে না, বরং পুরো পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানা থাকলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ক্লান্তি ভাব এবং হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া- এসবই হলো ডায়াবেটিসের সতর্কবার্তা। অনেক সময় মানুষ এগুলোকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যায়। সচেতনতা দিবসের আলোচনা সভায় এসব লক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় যাতে মানুষ শুরুতেই সতর্ক হতে পারে। ডায়াবেটিসের জটিলতা যেমন- কিডনি অকেজো হওয়া, চোখের দৃষ্টি হারানো বা হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সাবধানতা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

জনসচেতনতামূলক র‌্যালি আয়োজন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সংহতির প্রতীক। যখন হাজার হাজার মানুষ রঙিন ফেস্টুন হাতে সচেতনতার ডাক দিয়ে রাজপথে নামে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়। এটি একটি নীরব বিপ্লব যা মানুষকে সুস্থ থাকার প্রেরণা দেয়। বাডাসের এই র‌্যালিগুলোতে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাধারণ রোগীরাও অংশগ্রহণ করেন, যা সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে। এই গণমিছিল আমাদের এই বার্তাই দেয় যে ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে আমরা সবাই একতাবদ্ধ।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই ডায়াবেটিকস সচেতনতা দিবস ও বাডাসের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আমাদের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এক মাইলফলক। উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অংশ। ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ, আর এই যুদ্ধে আমাদের প্রধান অস্ত্র হলো সচেতনতা। বাডাসের নির্দেশিত পথে চলে এবং সুস্থ জীবনধারার চর্চা করে আমরা একটি সুন্দর ও কর্মময় বাংলাদেশ গড়তে পারি। আজ এই বিশেষ দিনে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার হোক- নিজের যত্ন নেব, পরিবারকে সুস্থ রাখব এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবসময় সজাগ থাকব। সুস্থ দেহেই বাস করে সুন্দর মন, আর সেই সুন্দর মনই গড়বে আগামীর সুন্দর পৃথিবী।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত