ঢাকা রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অমর একুশে বইমেলার বিবর্তন ও ইতিহাস

আমানুর রহমান
অমর একুশে বইমেলার বিবর্তন ও ইতিহাস

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, তবে তার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং আবেগঘন উৎসবটি হলো অমর একুশে বইমেলা। এটি শুধু বই কেনা-বেচার একটি গতানুগতিক মেলা নয়, বরং আমাদের জাতীয় চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ঢাকার বাতাস যেন নতুন বইয়ের গন্ধে মণ্ডম করে ওঠে। এই মেলার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এক দীর্ঘ ও সংগ্রামের পথচলা, যার শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে, কিন্তু তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বইমেলার এই মহীরুহ হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগ এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শ্রম।

১৯৭২ সাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পরের ঘটনা। চিত্তরঞ্জন সাহা নামে এক স্বপ্নদ্রষ্টা প্রকাশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাংলা একাডেমি চত্বরের বর্ধমান হাউসের সামনে বটতলায় একটি চট বিছিয়ে মাত্র ৩২টি বই নিয়ে বসেছিলেন। সেই বইগুলো ছিল কলকাতার ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের বই। তখন কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি যে, সেই ৩২টি বইয়ের ক্ষুদ্র আয়োজনই একদিন পরিণত হবে বাঙালির বিশ্বজনীন এক সাহিত্য উৎসবে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চিত্তরঞ্জন সাহা অনেকটা একাই এই মেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন। ১৯৭৬ সাল নাগাদ অন্যান্য প্রকাশকরাও অনুপ্রাণিত হয়ে এই চত্বরে আসতে শুরু করেন এবং মেলার কলেবর কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

?মেলার এই স্বতঃস্ফূর্ত পথচলায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে চারপাশ থেকে। ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী একাডেমিকে এই আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দাঁড় করান। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এর ফলে মেলাটি শুধু একটি সাধারণ প্রদর্শনী থেকে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তবে মেলার পূর্ণাঙ্গ নামকরণ এবং এর ব্যাপ্তি বড় আকার ধারণ করে আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে এই মেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। সেই থেকে এটি একুশের অবিনাশী চেতনার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে মাসব্যাপী এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা স্মরণ করি বায়ান্নর ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেলার পরিধিও বেড়েছে অভাবনীয়ভাবে। আশির দশকে মেলা যখন শুরু হয়েছিল, তখন এটি শুধু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পাঠকের উপচে পড়া ভিড় আর প্রকাশকদের স্থানের চাহিদার মুখে ২০১৪ সালে মেলার একাংশ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এটি একটি বিশাল সাংস্কৃতিক জনপদে পরিণত হয়েছে। বইমেলার প্রতিটি ধূলিকণা যেন বাংলা ভাষার মমতা মাখা। এখানে নবীন লেখকের কাঁচা হাতের লেখা আর প্রবীণ সাহিত্যিকদের কালোত্তীর্ণ সৃষ্টির এক অপূর্ব মিলনমেলা ঘটে। মেলা উপলক্ষে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়, যা আমাদের দেশের প্রকাশনা শিল্পকে এক মজবুত ভিত্তি দান করেছে। ?তবে বইমেলার সৌন্দর্য শুধু বইয়ের স্তূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতির এক বিশাল মেলবন্ধন। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘শিশু প্রহর’, খুদে পাঠকদের কলকাকলি, লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা কিংবা মেলার মূল মঞ্চের সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে বইমেলা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের এক পশলা স্বস্তি। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে ই-বুক বা ডিজিটাল মাধ্যমের চল বাড়লেও, বইমেলায় গিয়ে নতুন বইয়ের গন্ধ নেওয়া আর প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ সংগ্রহের যে আদিম তৃপ্তি, তা অন্য কিছুতে মেলা ভার। এই মেলা আমাদের জাতিগত আত্মপরিচয় মনে করিয়ে দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার সুঅভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করে। বাঙালির লড়াই ছিল ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য, আর সেই ভাষার চর্চা ও শ্রীবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চারণভূমি হলো এই অমর একুশে বইমেলা। এটি আমাদের জাতীয় বাতিঘর, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আলোর বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে এবং বাঙালিকে বারবার তার শেকড়ের সন্ধানে ফিরিয়ে আনে।

আমানুর রহমান

লেখক, কবি ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত