ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জলবায়ু পরিবর্তন ও ঢাকামুখী অভিবাসন নগর সংকটের বিস্তার

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
জলবায়ু পরিবর্তন ও ঢাকামুখী অভিবাসন নগর সংকটের বিস্তার

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমি ও নদীনির্ভর দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ তাদের বসতভিটা হারাচ্ছেন। এসব মানুষ বাধ্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এই স্থানান্তরকে সাধারণভাবে জলবায়ু-সৃষ্ট অভিবাসন বলা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অভিবাসনের প্রধান গন্তব্য হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। ঢাকা শহর ক্রমশ জলবায়ু-অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ঢাকা এরইমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্থানচ্যুতি নতুন কোনো ঘটনা নয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে নদীভাঙন একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। যখন এসব মানুষ জীবিকা ও বাসস্থানের নিরাপত্তা হারায়, তখন তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকাকে তারা সম্ভাবনার শহর হিসেবে দেখে। ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল নগরীগুলোর একটি। স্বাধীনতার সময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কয়েক লাখের মতো। কিন্তু আজ তা তিন কোটিরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত মানুষ। তারা সাধারণত কম দক্ষ শ্রমিক হিসেবে শহরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। রিকশা চালানো, নির্মাণশ্রমিক, গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক, গৃহকর্মী কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার মতো কাজে তারা যুক্ত হয়। যদিও এসব কাজ তাদের জন্য অস্থায়ী আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি। ঢাকায় আগত অধিকাংশ জলবায়ু-অভিবাসীর প্রধান সমস্যা হলো বাসস্থান। শহরের জমির দাম অত্যন্ত বেশি হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য স্থায়ী আবাসনের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে তারা শহরের বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেমন কোরাইল, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা তেজগাঁও এলাকায় বড় বড় বস্তি গড়ে উঠেছে।

এসব বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশই নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে। কিন্তু এসব এলাকায় বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত অনিরাপদ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির অভাব এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত বিদ্যমান। নগর ঝুঁকিপূর্ণতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবকাঠামোগত চাপ। ঢাকার রাস্তা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এরইমধ্যেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ার ফলে এই সেবাগুলোর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নগরবাসীর জীবনযাত্রা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট এখন ঢাকার দৈনন্দিন বাস্তবতা। জলবায়ু-সৃষ্ট অভিবাসন নগর পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলছে। নতুন বসতি গড়ে তোলার জন্য অনেক সময় খাল, জলাশয় বা নিম্নভূমি ভরাট করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শহরে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে সবুজ এলাকা কমে যাওয়ার ফলে শহরের তাপমাত্রাও ক্রমাগত বাড়ছে। বিধায় নগর পরিবেশ ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও জলবায়ু-অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। শহরে নতুন করে আসা মানুষেরা অনেক সময় সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকেন। তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার অভাব থাকায় ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনেক ক্ষেত্রেই তারা অস্থায়ী বা অনিরাপদ কাজে যুক্ত থাকে। এর ফলে তাদের আয় অনিশ্চিত থাকে এবং সামাজিক সুরক্ষাও খুব সীমিত থাকে। এছাড়া শহরের প্রান্তিক এলাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সামাজিক সমস্যা যেমন কিশোর অপরাধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি বা শিশু শ্রমের প্রবণতাও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে জলবায়ু-সৃষ্ট অভিবাসনকে শুধুমাত্র সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীরা নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং বিভিন্ন খাতে সস্তা শ্রম সরবরাহ করে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিমালার মাধ্যমে এই অভিবাসনকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগেও পরিণত করা সম্ভব। দিনদিন কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে।

ফলে ঢাকায় বেকার লোকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তাই প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে বেকারত্বের হার কমানো সম্ভব। ঢাকা শহরের নগর ঝুঁকিপূর্ণতা কমানোর জন্য পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং বস্তি উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। এতে করে নিম্নআয়ের মানুষ নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে। নগর অবকাঠামো যেমন পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। জলবায়ু-অভিবাসীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে সিট বাড়ানো জরুরি। কারণ গ্রাম থেকে উঠে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা যেন সহজে পড়াশোনা করতে পারে। একই সাথে গ্রামীণ এলাকায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় মানুষ নিরাপদ জীবন ও জীবিকার সুযোগ পায়, তাহলে শহরমুখী অভিবাসনের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা জরুরি। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হলেও এই সমস্যার জন্য তার অবদান খুবই কম। তাই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবশেষে বলবো, ঢাকা শহরে জলবায়ু-সৃষ্ট অভিবাসন একটি জটিল বাস্তবতা। এটি একদিকে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিফলন। অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে ঢাকা শহরকে আরও সহনশীল ও বাসযোগ্য নগরে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত