প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ মার্চ, ২০২৬
বাঙালি মুসলিমের হৃদয়ে ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর ত্যাগের মহিমা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উৎসবের আবহে যুক্ত হয়েছে এক তিক্ত অনুষঙ্গ-অস্বাভাবিক বাজারদর। ঈদ আসার বেশ আগে থেকেই হু হু করে বাড়তে থাকে নিত্যপণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে চিনি, সেমাই এবং মাংস- সবকিছুই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। প্রতিবারই ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে একই গৎবাঁধা অজুহাত দেওয়া হয় : ‘বাড়তি চাহিদা’। কিন্তু প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বাড়তি চাহিদাই কি বাড়তি মূল্যের একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে, অন্য কোনো অশুভ অপতৎপরতা?
অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, কোনো পণ্যের সরবরাহ স্থির থেকে যদি চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তবে তার দাম কিছুটা বাড়তে পারে। ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার সময় দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোগব্যয় বেড়ে যায়। সবাই চায় সাধ্যমতো ভালো খেতে এবং প্রিয়জনকে উপহার দিতে। এই বাড়তি চাহিদাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আমাদের বাজারে যা ঘটে, তাকে শুধু ‘চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা’ বললে সত্যের অপলাপ হবে।
বিশ্বের অনেক দেশেই বড় বড় ধর্মীয় উৎসবের সময় ব্যবসায়ীরা ছাড় (Discount) দেন। সেখানে উৎসবকে দেখা হয় সেবার মানসিকতা দিয়ে। অথচ আমাদের দেশে উৎসব মানেই যেন মুনাফা লুটে নেওয়ার মহোৎসব। চাহিদাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটছে সাধারণ মানুষের। যখন দেখা যায়, যে বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ছে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, যে এটি ‘চাহিদা’র কারণে নয়, বরং ‘লোভ’ ও ‘কালোবাজারি’র কারণে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাজারের একটি বড় অভিশাপ হলো সিন্ডিকেট। গুটিকয়েক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা কৃত্রিমভাবে পণ্য আটকে রেখে দাম বাড়িয়ে দেন। যখন খুচরা বাজারে দামের আগুন লাগে, তখন তারা স্রেফ সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেন। অন্যদিকে, কৃষক বা উৎপাদক পর্যায়ে পণ্যের দাম অনেক সময় বাড়ে না। মাঝপথে থাকা ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূলত লভ্যাংশের সিংহভাগ হাতিয়ে নিচ্ছে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি এবং ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত টোল আদায়ের খড়গও শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা প্রশাসন অভিযান চালায় ঠিকই; কিন্তু তা যেন সাগরের মাঝে বালির বাঁধ। মাঝেমধ্যে নামমাত্র জরিমানা কিংবা লোক দেখানো তদারকি অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে কোনো ভীতি তৈরি করতে পারছে না। বরং জরিমানা দিয়ে তারা দ্বিগুণ উৎসাহে পুনরায় দাম বাড়িয়ে দেয়। বাজার তদারকি শুধু ঈদকেন্দ্রিক না হয়ে সারা বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হওয়া জরুরি। টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়ানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে আমাদের দেশে মুদ্রাস্ফীতির যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের সীমা বাড়ছে না, অথচ ব্যয়ের পাল্লা ভারি হচ্ছে প্রতিদিন। এই অবস্থায় ঈদের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে। ঈদের আনন্দ যেখানে ভাগ করে নেওয়ার কথা, সেখানে আকাশচুম্বী বাজারদর সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করছে
উৎসবের আনন্দ কেন শুধু বিত্তশালীদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হবে? বাড়তি চাহিদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। ঈদ মানে আনন্দ ভাগাভাগি, শোষণ নয়। ব্যবসায়ীদের নীতি-নৈতিকতা এবং সরকারের কঠোর নজরদারি- এই দুয়ের সমন্বয় ছাড়া ঈদপণ্যের বাজারের এই নৈরাজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা চাই না বাড়তি মূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কারও ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে যাক। উৎসব হোক- সবার জন্য আনন্দময় এবং স্বস্তিদায়ক।