ঢাকা বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য বদলাবে কবে

মোজাহিদ হোসেন
গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য বদলাবে কবে

দিনের পর দিন চলে যায়, মাসের পর মাস চলে যায়, বছরের পর বছর চলে যায় কিন্তু গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের গতিপথ পরিবর্তন হয় না। দেশের সরকার পরিবর্তন হয়, এমপি পরিবর্তন হয়, এলাকার চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় গ্রামের মেম্বার পর্যন্ত কিন্তু পরিবর্তন হয় না গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান। সৃষ্টির আদিকাল থেকে গ্রামের মানুষের জীবন, জীবিকা ও গতিপথ একই। যে মজুর তার জীবন মজুরীতেই যায়, যে কৃষক সে কৃষকই, যে ভ্যানচালক তার জীবন ভ্যানচালেই শেষ। যেই ব্যক্তি যে পেশায় জড়িত, তার জীবন, জীবিকা সেভাবেই শেষ হয়। গ্রামের মানুষেরা সাধারণত সহজ, সরল হয়। না বুঝে রাজনীতি না বুঝে সমাজনীতি। পেটনীতি নিয়েই জীবন অতিবাহিত করে। পেটের দায়ে জীবনের সব সুখ বিসর্জন দেয়। এই সুযোগে সমস্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এই মানুষদের ব্যবহার করে নিজেরা নিজেদের উদ্দেশ হাসিল করে । কিন্তু এই মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিকে কেউ তাকায় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গ্রামের কৃষকদের অবদান অনেক। কেননা গ্রামের সবাই কোনো না কোনোভাবে কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তারা তাদের পরিশ্রমের যথাযথ ফলাফল পায় না। ফসল তোলার পর বিক্রির উপযুক্ত করলেই দেখা যায় বাজার সিন্ডিকেট। উৎপাদিত পণ্যের দাম অনেক কম। লাভ তো হয় না বরং লোকসান। ফলে দেখা যায়- কৃষকেরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফসল ফলিয়েছে, সেই পরিমাণ অর্থই ঘরে আনতে ব্যর্থ। দিনশেষে দোকানের সার, কীটনাশক বা ঔষধের টাকায় পরিশোধ করতে পারে না। পরিবার চালানো তো অনেক দূরের কথা। এভাবে বরাবরই কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়। জীবনমানের উন্নতি আর হয় না। বরং ঋণের বোঝা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।

আবার গ্রামের অনেকে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর জন্য শহরে চলে যায়। কেউ রিকশা চালায়, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, কেউ রাস্তার কাজে যুক্ত হয়, কেউ বিভিন্ন কোম্পানিতে ডে-লেবারের কর্মী হিসেবে যুক্ত হয়। যে যেখানে পারে যুক্ত হয়। কিন্তু সারাদিন দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে যে বেতন পায় তা দিয়েই সংসার চালানোই কষ্টকর। ভাগ্য বদলানো অনেক দূরের বিষয়।

অন্যদিকে, গ্রামের এই সহজ-সরল মানুষরা সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। আইন , বিচারসহ অন্য সব ক্ষেত্রে। বলা হয়ে থাকে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু বাস্তবতায় আইনে চোখে অর্থের প্রাধান্য, আইনের চোখে ক্ষমতার প্রাধান্য। গ্রামে কোনো মেয়ে ধর্ষিত হলে দেখা যায় গ্রামের পাতিনেতারা অর্থের ভিত্তিতে সমাধান করে। পত্রিকায় এমন খবর অনেক পাওয়া যায়। আবার ভুক্তভোগী আইনের দারস্থ হলে আসামী পক্ষ অর্থের বিনিময়ে, ক্ষমতার দাপটে সবকিছু যেখানে ছিল, সেখানেই শেষ করে দেয়। সঠিক বিচার আর পাওয়া হয় না। এটা শুধু মাত্র একটা উদাহরণ। এরকম হাজারো বৈষম্যের শিকার হয় এই সহজ সরল মানুষেরা। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আদৌও কি এর শেষ হবে বাংলাদেশে?

মানুষের মৌলিক অধিকার- যেগুলো না হলেই নয়। জীবন বেঁচে থাকার জন্য যা অত্যাবশ্যক। যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও চিত্তবিনোদন। কিন্তু গ্রামের মানুষের এসব মৌলিক অধিকার সরকার কতটুকু নিশ্চিত করতে পারছে? এখানও মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, একবার খেতে পারলে আরেকবার খেতে পারে না। বাজার সিন্ডিকেট আরেক বড় সমস্যা। বিশেষ করে, যারা দিন এনে দিন খায় তাদের জন্য। অনেকে রুটি খেয়েও দিনাতিপাত করা লাগে দিনের পর দিন। নুন আনতে পান্তা ফুরায়, যার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় গ্রামে। সুষম খাদ্য তো অনেক দূরের বিষয়। ভুগতে হয় অপুষ্টিতে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (GdGI) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’-এর অন্য আরেক রিপোর্টে উঠে এসেছে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থা মিলে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলো হলো এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ।

দুই প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু খাদ্যনিরাপত্তার সংকটেই নয়, স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে গত সাত বছরে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনও দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার। বস্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় পুরাতন কাপড় পরেই জীবন শেষ। শীতকাল এর বাস্তবতা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

মোজাহিদ হোসেন

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত