প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ মার্চ, ২০২৬
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে মিলন। পারিবারিক এই মিলনের সমীকরণের বাইরে এবারও এক বিরাট অংশের মানুষের জীবনে যুক্ত হয় শুধু বিচ্ছেদ আর দীর্ঘশ্বাস। যখন বাংলার প্রতিটি ঘরে সেমাইয়ের সুবাস আর নতুন পোশাকের খসখসানি শব্দে উৎসব মুখর হয়, তখন কিছু মানুষ ব্যস্ত থাকেন অন্যের উৎসবকে রাঙাতে, কিংবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চার দেয়ালের আড়ালে অথবা খোলা আকাশের নিচে।
ঘরে না ফেরা মানুষের ঈদ’ এক পশলা বৃষ্টির মতো- যার একদিকে আছে কর্তব্যের তৃপ্তি, আর অন্যদিকে আছে না পাওয়ার এক গহীন আর্তনাদ।
২০২৬ সালের এই সময় দাঁড়িয়ে ঘরে ফেরার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে মনে হয় বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু এই বিশাল জনসমুদ্রের বিপরীতে কয়েক লাখ মানুষ দায়িত্বের বোঝা রেখে নাড়ির টানে গৃহে ফিরতে পারেনি। পুলিশ, নার্স, চিকিৎসক, ফায়ারসার্ভিস ও গণমাধ্যম কর্মীসহ সব সেবা পেশায় নিয়োজিত প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষ কর্মস্থলেই এবারের ঈদে অবস্থান করে। ঘরে না ফেরা মানুষের তালিকায় এক বিশাল অংশজুড়ে ছিল আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এবং চিকিৎসকরা। হয়তো কোনো একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য যখন তপ্ত পিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘাম মুছতে মুছতে যানবাহন সামলাচ্ছিলেন, তখন তার মুঠোফোনে হয়তো তার ছোট মেয়ের কল এসেছিল- ‘বাবা, কখন আসবা?’ তিনি হাসিমুখে উত্তর দেন, ‘এই তো মা, কাজ শেষ করে আসব।’ অথচ তিনি জানেন, এই ঈদ তার কাটবে ধোঁয়া আর ধুলার শহরেই।
আবার হাসপাতালের করিডোরে সাদা অ্যাপ্রন পরা চিকিৎসক যখন মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ান, তখন তার নিজের পরিবারের ঈদ আনন্দ বিলীন হয়ে যায় সেবার ব্রতে। অন্যের জীবন বাঁচানোর আনন্দই তখন তার কাছে ঈদের সওয়াব হয়ে ধরা দিয়েছিল। তাদের এই যে আত্মত্যাগ, তা মূলত আমাদের সমাজের উৎসব সচল রাখে। প্রিয়জনের নিকট পৌঁছে দিতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ যারা বাস, ট্রেন, লঞ্চের কর্মচারী হিসাবে কর্মরত ছিলেন তারাও ঘরে ফিরতে পারেনি।
অন্যদিকে ঈদের এই উৎসব যাদের এক চিলতে ভিডিও কলের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে সেই সব প্রবাসীরা ঈদসহ আরও নানান উৎসব পার্বণে প্রিয় মানুষদের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়। প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসীর ২-৩ শতাংশ ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরতে পেরেছে। দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীদের জন্য ঈদ মানে এক অসহ্য একাকীত্ব। মরুভূমির তপ্ত বালু কিংবা বিদেশের শীতল পরিবেশে কাজ শেষে যখন তারা ঘরে ফেরেন, তখন হয়তো একাকী ডাল-ভাত খেতে খেতে মনে পড়ে দেশের বাড়ির সেই উৎসবের আমেজের কথা। মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ যেন সুদূর প্রবাসে ভেসে আসে। প্রবাসীদের রক্তজল করা ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাদের পাঠানো টাকায় পরিবারের বাকিরা নতুন কাপড় পরেছে, কিন্তু সেই মানুষটি নিজেই হয়তো ঈদের দিন একটি পুরোনো শার্ট পরেই পার করে দিয়েছে। তাদের ঈদ মানে ফোনের ওপাশে থাকা প্রিয়তমা স্ত্রীর কণ্ঠস্বর আর সন্তানদের হাসিমুখ দেখা।
আপন গৃহে ফিরতে না পারার তালিকার সবচেয়ে বিষাদময় নামটা হয়তো পথশিশুর। তাদের জন্য ‘ঘর’ বা ‘ঈদ’- দুটোই এক অলীক কল্পনা। ঈদের দিন সকালে যখন নাগরিক শিশুরা আতর মেখে রঙিন পাঞ্জাবি পরে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাচ্ছিল, তখন হয়তো কারওয়ান বাজার কিংবা কমলাপুর স্টেশনের কোনো এক কোণে ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে ঘুম ভেঙেছে এদের। তাদের কাছে ঈদ মানে ছিল অন্য দশটা দিনের মতোই পেটের ক্ষুধা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এবং সাম্প্রতিক বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ পথশিশু রয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি ঢাকা শহরে অবস্থান করে।
পথশিশুদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে হলো মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার বা দয়া করে দেওয়া কিছু টাকা। তাদের কোনো নতুন জামা নেই, নেই মায়ের আদর। তাদের ঈদ কাটে ট্রাফিক সিগনালে গাড়ির জানালার কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে। যেখানে বড়লোকের গাড়ির ভেতরে নতুন পোশাক পরা সমবয়সী শিশুটি দেখে তাদের মনে যে বিষাদ জন্মায়, তার কোনো পরিসংখ্যান কোনো দপ্তরে জমা থাকে না। তাদের কাছে উৎসব শুধু এক নীরব হাহাকার। ফুটপাতের এক চিলতে নোংরা চাদরই ছিল তাদের ঈদগাহ, আর ক্ষুধার জ্বালাই তাদের একমাত্র অনুভূতি। পরিশেষে বলা যায়, ঈদ শুধু ক্যালেন্ডারের পাতার একটি তারিখ নয়, বরং এটি হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সেতু বন্ধনের দিন। কিন্তু যারা এই মহোৎসবে ঘরের আঙিনায় পৌঁছাতে পারলেন না, তাদের বুকের ভেতরটা যেন এক একটি জনশূন্য সাহারা। সেই নিঃসঙ্গ ট্রাফিক পুলিশ বা শ্রান্ত নার্স কিংবা বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো সেই প্রবাসী ভাইটি তাদের প্রত্যেকের বিসর্জনেই গড়া আমাদের এই সামষ্টিক আনন্দ। বিশেষ করে সেই সব পথশিশুরা, যাদের শৈশব ধুলোমাখা রাজপথে হারিয়ে গেছে, তাদের কাছে ঈদের চাঁদ যেন এক টুকরো ঝলসানো রুটির চেয়ে বেশি কিছু নয়। সমাজের এই বৈষম্যের দেয়ালে যেন উৎসব থমকে দাঁড়ায়, তখন আমাদের আনন্দ হয়ে পড়ে ফিকে এবং ম্লান। আমাদের প্রথাগত উদযাপনের ঊর্ধ্বে উঠে আজ ভাবার সময় এসেছে। ঈদের প্রকৃত সার্থকতা সেমাইয়ের মিষ্টিতে নয়, বরং অন্যের চোখের জল মোছানোর মধ্যে নিহিত। আমাদের করণীয় হলো উৎসবের এই ক্ষণে আমাদের আনন্দটুকু সেই সব বঞ্চিতদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া।
তানজিম হোসেন
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়