ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজনীতির চিরায়ত দৈন্য কাটিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

রাজনীতির চিরায়ত দৈন্য কাটিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কাদা ছোড়াছুড়ি, অসহিষ্ণুতা আর প্রতিহিংসা যখন একসময় অলঙ্ঘনীয় নিয়মে পরিণত হয়েছিল, ঠিক সেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশে গতকাল দেখা গেল একঝলক সোনালি রোদ। সোমবার দুপুরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎটি শুধু একটি সৌজন্য বিনিময় ছিল না; বরং এটি ছিল আগামীর স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশের এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার।

গতকাল জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্পিকারের সহধর্মিণীর জানাজা শেষে দুই নেতার পাশাপাশি হাঁটা এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সংসদ সচিবালয়ে তাদের মধ্যকার ২০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বৈঠকের চেয়েও বড় হয়ে ধরা দিয়েছে বিদায়লগ্নে প্রধানমন্ত্রীর সেই সৌজন্যতা- যখন তিনি নিজেই বিরোধীদলীয় নেতাকে খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানান।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দুই মেরুর নেতাদের মধ্যে সামাজিক সৌজন্যটুকুও বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সেই অচলায়তন ভেঙে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে শিষ্টাচার ও আতিথেয়তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এটি কোনো লোক দেখানো নাটকীয়তা নয়, বরং একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একটি রাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যায়, তখন রাজপথের লড়াইয়ের চেয়ে টেবিলের সংলাপ অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্যের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও বিরোধীদল যদি পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে পারে, তবে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ওপরও। যখন শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতার মধ্যে হাসিমুখে কথা হয়, তখন মাঠপর্যায়ে সংঘাত ও রক্তপাতের আশঙ্কা অনেকাংশে কমে আসে।

‘গণতন্ত্র মানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং সংখ্যালঘিষ্ঠ বা বিরোধীমতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। গতকালের এই দৃশ্য সেই দর্শনেরই প্রতিফলন।’ বিগত নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে সরকার গঠনের পর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ধৈর্য ও উদারতার পরিচয় দিয়ে আসছেন, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও গঠনমূলক বিরোধিতার যে সংস্কৃতি লালন করছেন, তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মজবুত করছে।

আমরা মনে করি, জাতীয় স্বার্থে দুই নেতার এই হৃদ্যতা বজায় থাকা জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতির মতো মৌলিক ইস্যুগুলোতে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ হওয়া প্রয়োজন। সংসদ সচিবালয়ে গতকালের সেই ২০ মিনিট হতে পারে আগামীর কোনো মহৎ সমঝোতার সূচনাবিন্দু।

দেশের সাধারণ মানুষ রাজনীতিকদের কাছ থেকে তিক্ততা নয়, বরং সুস্থ ধারার প্রতিযোগিতা আশা করে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে ভিন্নমতের প্রতি থাকবে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা এবং সরকারি ও বিরোধী বেঞ্চের দূরত্ব কমে আসবে জাতীয় প্রয়োজনে। গতকালের সেই দৃশ্য যেন শুধু একদিনের শিরোনাম না হয়, বরং তা যেন আমাদের স্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়।

প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতাকে তার কার্যালয় থেকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানিয়েছেন, তা প্রতীকীভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকেই এগিয়ে দেওয়ার নামান্তর। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ দ্রুতই একটি প্রকৃত কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমরা আশা করি, এই সৌজন্যের রেশ যেন রাজপথের উত্তাপ কমিয়ে আলোচনার টেবিলে প্রশান্তি নিয়ে আসে। রাজনীতির ময়দানে আদর্শিক লড়াই থাকুক, কিন্তু সেখানে যেন সৌজন্য ও শিষ্টাচারের অভাব না ঘটে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত