ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শৈশব ও কৈশোরের ক্রীড়া স্মৃতি

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
শৈশব ও কৈশোরের ক্রীড়া স্মৃতি

খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনের এক শাশ্বত পথ। শৈশব ও কৈশোরের সোনালি দিনগুলোতে খেলার মাঠই ছিল আমাদের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা, যেখানে হার-জিতের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা শিখেছি একতা আর সহনশীলতা। জীবনের এই চঞ্চল সময়ে মাঠের ধুলোবালি মেখে বেড়ে ওঠার স্মৃতিগুলো আজও প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে। ব্যক্তি জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রীড়া আজ বিশ্বজনীন এক ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাকে একই সুতোয় গেঁথে রাখে। কবির ভাষায়- ‘খেলাধুলা আর কিছু নয়, জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি, যেখানে বারবার পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস জন্মায়।’

শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ক্রীড়াকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে প্রতি বছর ৬ এপ্রিল পালিত হয় ‘উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস’। এই দিনটির মূল তাৎপর্য হলো সমাজের বৈষম্যদূর করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং বিশ্বজুড়ে সংঘাত নিরসনে খেলাধুলার ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানো। একটি সুশৃঙ্খল বিশ্ব বিনির্মাণে ক্রীড়া যে কতটা শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, এই দিবসটি আমাদের সেই সচেতনতার বার্তা দেয়। খেলাধুলা শুধু শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নেও অনবদ্য ভূমিকা পালন করে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় ‘অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ক্রীড়া’ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবস্তরের মানুষকে খেলাধুলার মূলধারায় সম্পৃক্ত করে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

‘ক্রীড়া’ শব্দটির বুৎপত্তিগত ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র?্যময়। সংস্কৃত ‘ক্রীড’ ধাতু থেকে ক্রীড়া শব্দের উৎপত্তি, যার আভিধানিক অর্থ হলো খেলা বা আমোদণ্ডপ্রমোদ। আদিম যুগে মানুষ যখন শিকারি ছিল, তখন তাদের জীবনধারণের প্রতিটি কৌশলই ছিল এক প্রকার শারীরিক কসরত, যা কালক্রমে নিয়মতান্ত্রিক খেলায় রূপ নেয়। গ্রিক অলিম্পিয়া থেকে শুরু করে মেসোপটেমীয় সভ্যতা পর্যন্ত ক্রীড়ার বিবর্তনের ধারাটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত বীরত্ব ও শক্তির প্রদর্শনী। মধ্যযুগের দিকে এসে এটি সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।

সময়ের বিবর্তনে ক্রীড়া আজ শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং কৌশল ও মেধার সংমিশ্রণে এক আধুনিক রূপ লাভ করেছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আইন ও নিয়মে খেলাধুলা পরিচালিত হতে থাকে। বর্তমান বিশ্বে এটি কেবল শখের বশে খেলা কোনো কাজ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহাকবি কালিদাসের কাব্যেও শারীরিক কসরত ও খেলাধুলার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করে যে মানবসভ্যতার উন্মেষকাল থেকেই ক্রীড়া ছিল মানুষের জীবনের চিরন্তন সঙ্গী।

শারীরিক শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রীড়া হলো সুস্থ জীবনযাপনের মূলভিত্তি। নিয়মিত খেলাধুলা পেশি ও হাড়ের গঠন মজবুত করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি শুধু ব্যায়াম নয়, বরং শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুশৃঙ্খল সঞ্চালনের এক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ক্রীড়া হলো সকল ওষুধের শ্রেষ্ঠ বিকল্প। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো আধুনিক জীবনযাত্রার রোগগুলো থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। একজন চিকিৎসকের কাছে মাঠের একটি গোল বা একটি দৌড় হলো দীর্ঘায়ু হওয়ার এক প্রাকৃতিক প্রেসক্রিপশন।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে ক্রীড়া মানুষের মানসিক চাপ কমিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা দূর করতে খেলার মাঠ এক জাদুকরী নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মানব বিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, খেলাধুলা মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে পরিশীলিত করে সামাজিক মানুষে রূপান্তর করে। এটি মানুষের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করেছে। সমাজ বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে ক্রীড়া হলো- সামাজিক সংহতির প্রতীক। মাঠে যখন এগারোজন খেলোয়াড় খেলে, তখন তারা কোনো বিশেষ ধর্ম বা বর্ণের পরিচয় দেয় না, বরং একতাবদ্ধ একটি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে।

অর্থনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্রীড়া আজ এক বিশাল শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের মতো আয়োজনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রসায়ন বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, খেলাধুলার সময় শরীরে ডোপামিন ও এন্ডোরফিনের মতো সুখী হরমোন নিঃসরণ হয়, যা মানুষের মেজাজ ফুরফুরে রাখে। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ছাড়া ক্রীড়া অচল; একটি ফুটবল যখন বাতাসে বাঁক নেয় বা একজন ক্রিকেটার যখন বলটি সীমানার বাইরে পাঠান, সেখানে বলবিদ্যা ও গতির সূত্রগুলো কাজ করে। গণিত বিজ্ঞানের হিসেবে ক্রীড়া হলো নিখুঁত জ্যামিতিক কোণ ও পরিসংখ্যানের খেলা, যেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব অত্যন্ত মূল্যবান।

এই পর্বে আমি আমার স্কুল ও কলেজের দিনগুলোর খেলার মাঠের কিছু স্মৃতি রোমন্থন আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি : আমি মনে-প্রাণে একজন ক্রীড়ানুরাগী। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আমার ছিল প্রবল ঝোঁক। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক, সমাজসেবা ও স্কাউটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অন্যদের মতো খেলার মাঠে খুব বেশি সময় দেওয়া হয়ে ওঠেনি। খেলাধুলায় সরাসরি অংশগ্রহণের চেয়েও আমার বেশি আনন্দ ছিল খেলার পরিবেশ তৈরিতে। সময় পেলেই আমি খেলার মাঠ বা গ্রাউন্ড প্রস্তুত করতে মেতে উঠতাম।

আমাদের গ্রামে শীতকালে ‘রেটিকোট’ নামক একটি খেলার খুব প্রচলন ছিল। আমি নিজ হাতে এই খেলার কোর্ট তৈরি করতাম, যা ছিল আমার কাছে দারুণ এক নেশার মতো। ফুটবল ও ক্রিকেটের প্রতি আমার গভীর অনুরাগ থাকলেও ব্যস্ততার কারণে এই দুটি জনপ্রিয় খেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। তবুও খেলার মাঠের সেই কর্মব্যস্ততা আর উদ্দীপনা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।

লেখাপড়ার ব্যস্ততার মাঝে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পরপর বাবা যখন আমাকে গ্রামে নিয়ে আসতেন, সেই সময়টুকু ছিল আমার জন্য খুব আনন্দের। এই সুবাদে আমি একবার শহীদ নূর মোহাম্মদ স্মৃতি সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পাই। ক্লাবের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন ও দেখভালের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আমি নিজে খুব বড় মাপের খেলোয়াড় না হয়েও এই সাংগঠনিক দায়িত্বের কারণে দক্ষ খেলোয়াড়দের খুব কাছ থেকে দেখার ও মেশার সুযোগ পেয়েছিলাম।

এই ক্লাবের ফুটবল টুর্নামেন্টে কিছুদিন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আমার কাছে এক অমলিন স্মৃতি। বিশেষ করে বর্ষাকালের সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে; কর্দমাক্ত মাঠে কোচিং করাতে গিয়ে কতবার যে পেছলে আছাড় খেয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই!

তবে মাঠের খেলার চেয়েও বেশি মনে গেঁথে আছে দুই পক্ষের সেই চিরচেনা ঝগড়াঝাটি। খেলোয়াড়দের ফাউল করার ধরণগুলো ছিল যেমন অদ্ভুত, তেমনি অভিনব; যা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। সত্যি বলতে, ফুটবল মাঠে ফুটবলের চেয়েও যেন ‘গ্যাঞ্জাম’ চলত বেশি। সেই হট্টগোলে অংশগ্রহণকারীদের কাণ্ডকারখানা আর মারমুখী দৃশ্যগুলো যখনই মনে পড়ে, আমি আজও একা একা না হেসে পারি না।’

খেলাধুলার জগতে আমার অভিজ্ঞতা একটু ভিন্নধর্মী। আমি নিজে খুব ভালো খেলোয়াড় না হলেও, বিভিন্ন ক্লাবের ফাইনালসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার আছে।

তেমনি এক স্মৃতিময় ঘটনা ঘটেছিল আমাদের গ্রামে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আয়োজিত একটি টুর্নামেন্টে। ফাইনাল খেলা ছিল ‘সবুজ তরুণ’ বনাম ‘ইলেভেন স্টার’ ক্লাবের মধ্যে। হাইভোল্টেজ সেই ম্যাচে আম্পায়ারিংয়ের গুরুদায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। খেলা চলাকালীন গ্রাম্য ধারাভাষ্যকারের মাইকের অবিরাম আস্ফালনে আমার কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম। ওদিকে মাঠের পরিস্থিতিও ছিল বেশ নাটকীয়। খেলোয়াড়রা কারণে-অকারণে অদ্ভুত সব ভঙ্গিতে আর তীক্ষè চিৎকারে আউটের আবেদন জানিয়ে বারবার আমার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

সেই হট্টগোল আর চাপের মুখে এক সময় আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম এবং ভুলবশত একটি আউটের সিদ্ধান্ত দিয়ে বসলাম। ব্যস, মুহূর্তেই রণক্ষেত্র! দুই পক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়ে গেল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় মাঠে উপস্থিত আমার বড় ভাই এবং বন্ধু-বান্ধবরা আমার চারপাশে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর এক অদ্ভুত মীমাংসা হলো- বিজয়ী দলের জন্য নির্ধারিত পুরস্কারের টাকা দুই দলের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হলো। এভাবেই এক অমীমাংসিত সমাপ্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল আমার সেই স্মরণীয় আম্পায়ারিং অধ্যায়।

পরিশেষে বলতে চাই, ক্রীড়া শুধু জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, এটি জীবনের একটি দর্শন। শৈশবের সেই হারানো বল আর কৈশোরের ক্লান্ত বিকেলে মাঠ থেকে ঘরে ফেরার যে আনন্দ, তাই আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সুস্থ জাতি ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার জন্য মাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আসুন, আমরা খেলাধুলার মাধ্যমে হানাহানি ভুলে ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দিই। স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমিয় বাণী আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক- ‘গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে।’

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত