প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬
দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের তালিকায় সয়াবিন তেল এক অপরিহার্য নাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের বাজারে এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটি নিয়ে কারসাজি যেন এক অন্তহীন নাটকে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর আবারও সয়াবিন তেল নিয়ে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে, তা শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, বরং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের দোহাই দিয়ে কিংবা সরবরাহ সংকটের কৃত্রিম অজুহাত তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের এই অতিমুনাফা লাভের প্রচেষ্টা এখন জনভোগান্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির এই নেপথ্যে বরাবরই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত থাকে। লক্ষ্য করা গেছে যে, যখনই কোনো উৎসব বা বিশেষ সময় সামনে আসে, তখনই এক শ্রেণির মিল মালিক এবং বড় আমদানিকারকরা সরবরাহ কমিয়ে দেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডিলার ও পাইকারি পর্যায়ে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বাজারে এর দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। বাজারে তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাচ্ছে না, তার সদুত্তর কারও কাছে নেই। মিল গেট থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যে অদৃশ্য কারসাজি চলে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনের হিমশিম খাওয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করছে।
সরকার ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে তেল বিক্রি হওয়ার খবর এখন নিত্যদিনের শিরোনাম। অনেক সময় বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে খোলা তেলের আধিক্য বাড়ানো হয়, কারণ খোলা তেলের মান ও দাম কোনোটিই সঠিকভাবে তদারকি করা যায় না। এতে একদিকে যেমন ভোক্তা ঠকছে, অন্যদিকে মানহীন ভোজ্যতেল জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো যখন এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সরকার কেন তাদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে পারছে না?
আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো একটি পুরোনো কৌশল। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমে, তখন স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। আমদানিকৃত তেল দেশে পৌঁছাতে এবং বাজারজাত করতে যে সময় লাগে, সেই সময়ের মধ্যে বিশ্ববাজারের ঊর্ধ্বগতিকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দরপতনের সময় ‘পুরোনো স্টক’ শেষ হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটা হয়। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ভোক্তাদের স্বার্থ দেখার মতো কেউ নেই।
ভোজ্যতেলের বাজারে এই অস্থিরতা বন্ধে টিসিবির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো এবং খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্যে বিক্রয় কার্যক্রমকে আরও জোরালো করা প্রয়োজন। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সরিষা ও অন্যান্য তৈলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি সংস্থাকে শুধু নামমাত্র অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলতে হবে। বিশেষ করে যারা কৃত্রিমসংকট তৈরি করে মজুদদারি করছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে ভোজ্যতেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করে এই একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে হবে। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমকে শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে সয়াবিন তেলের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি এখনই এই কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে বাজারের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা আরও বাড়বে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সয়াবিন তেলের বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পণ্যমূল্য ফিরিয়ে আনবে। বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হোক এই সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার।