ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, জনজীবনে বৈরী প্রভাব

জাহিদ হাসান
জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, জনজীবনে বৈরী প্রভাব

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে জ্বালানি খাতের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে এর সামান্য পরিবর্তনও সমাজের প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব খুব গভীরভাবে পড়ে। শরীরে রক্ত ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না বা রক্ত কম হয়ে গেলে যেমন শরীর দুর্বল হয়ে যায়, তেমনিভাবে জ্বালানি তেল গ্যাস এদেশের প্রাণশক্তি। জ্বালানি তেল, গ্যাস উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, শিল্প সবখানেই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার নির্ধারিত নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ। এই সিদ্ধান্ত নিজেই ছিল বড় ধরনের অভিঘাত। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন করে আরেকটি চাপ যুক্ত হয়েছে এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় দাম বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য ১,৯৪০ টাকায় পৌঁছানো সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে। ২ এপ্রিল ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধির পর ১৯ এপ্রিল আবার ২১২ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা প্রমাণ করে জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা থামার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।

এই দুই ধরনের জ্বালানি একসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে সম্মিলিত প্রভাব তৈরি হয়েছে, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র। আগে যখন শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ত, তখন মানুষ অন্তত গৃহস্থালি পর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি পেত। আবার যখন গ্যাসের দাম বাড়ত, তখন পরিবহন খাতে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা কিছুটা ভারসাম্য তৈরি করত। কিন্তু এবার উভয় ক্ষেত্রেই একযোগে মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা রাখেনি। ফলে এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং একপ্রকার সামাজিক চাপেও রূপ নিয়েছে।

প্রথমেই গৃহস্থালি জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, এলপিজি গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সাংসারিক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাস সুবিধা সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ১,৯৪০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনতে হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের চাপ পড়ে। যেখানে আগে একটি পরিবার হয়তো মাসে একটি বা দেড়টি সিলিন্ডার ব্যবহার করত, এখন তারা খরচ বাঁচাতে রান্নার পরিমাণ কমাতে বা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে; কিন্তু সেই বিকল্পটাও বের করা কষ্টসাধ্য। গ্রামাঞ্চলে এই প্রভাব আরও ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। অনেক জায়গায় এখনও এলপিজি পুরোপুরি পৌঁছায়নি; কিন্তু যেখানে পৌঁছেছে, সেখানে এটি আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এখন হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আবার জ্বালানি কাঠ বা খড়ের মতো প্রথাগত জ্বালানিতে ফিরে যেতে পারে।

এদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খাতের মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়কপথনির্ভর, সেখানে ডিজেলের দাম বাড়ার অর্থ হলো- ট্রাক, বাস, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের খরচ বৃদ্ধি। এই বাড়তি খরচ পরিবহন মালিকরা নিজেরা বহন করেন না; বরং তা ভাড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে যাত্রী ও ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেন।

ফলে শহর থেকে গ্রাম সবখানেই যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যায়। একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত মানুষ, যিনি প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন, তার মাসিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্থনীতিকেই চাপে ফেলে না, বরং সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার মানকে নিম্নমুখী করে। আগে যেখানে একটি পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে এককভাবে পরিবহন খরচ দায়ী ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ও গৃহস্থালি পর্যায়ের ব্যয় বৃদ্ধি। উদাহরণস্বরূপ, একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সময় কৃষককে বেশি খরচ করতে হচ্ছে, সেচ ও পরিবহনে, আবার সেই পণ্য রান্না করতেও ভোক্তাকে বেশি খরচ করতে হচ্ছে গ্যাসের জন্য। অর্থাৎ একই পণ্যের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একটি উৎপাদন পর্যায়ে, অন্যটি ভোগ পর্যায়ে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একযোগে সব ধরনের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একপ্রকার ‘কম্পাউন্ড ইফেক্টৎ’ তৈরি করছে, যেখানে একটি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অন্য খাতের ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিল্প খাতেও এর প্রভাব গভীর। অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনের জন্য গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। এতে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এরমধ্যেই পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

মানুষকে ৯০ শতাংশ ভাড়া বেশি গুনতে হবে। বিবিসি বাংলার একটা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে অতীতে তেলের দাম বাড়ালে বাস ট্রাকের মালিকরাসহ তেলের উপর নির্ভরশীল প্রায় সব প্রতিষ্ঠান মূল্যবৃদ্ধি করে; কিন্তু পরবর্তীতে তেলের দাম কমলেও গাড়িভাড়াসহ যেসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল সেগুলোর দাম আর কম হয়নি কখনও।

কৃষি খাতেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের কৃষকরা সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করেন। ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে সেচ খরচ বাড়ে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। একজন কৃষক যখন বেশি খরচ করে ফসল উৎপাদন করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই তার পণ্যের দাম বেশি রাখতে চান। কিন্তু বাজারে ন্যায্য মূল্য না পেলে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার যদি দাম বাড়ানো হয়, তাহলে তা ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই দ্বৈত চাপে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগী একটি শ্রেণি। শিল্প খাতও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের পাশাপাশি ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুতের ঘাটতি বা অনিয়মিত সরবরাহের কারণে তারা জ্বালানি তেলের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে যায়। তেলের দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে পণ্যের দাম বাড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- এই মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আয় একই থাকলেও ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো এই পরিস্থিতি কতটা টেকসই? যদি জ্বালানির দাম এভাবেই বাড়তে থাকে এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আয় বৃদ্ধি না পায় তাহলে জনজীবন বহুমুখী গভীর সংকটের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মূল্য সমন্বয় করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর প্রভাব কমানোর জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি। যেমন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গ্যাসে ভর্তুকি প্রদান, গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার কঠোরভাবে মনিটরিং করা।

পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের একযোগে মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জনজীবনে এক অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করবে। আগের তুলনায় এর প্রভাব অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত, কারণ এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে সরাসরি আঘাত হানবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনমানকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অন্যথায়, এই মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে একটি গভীর সংকটের ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব বহন করতে হবে পুরো জাতিকেই।

জাহিদ হাসান

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত