প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
উচ্চশিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি স্থায়ী চাকরি হওয়া, এই ধারাবাহিকতাই দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। অনার্স জীবন থেকেই শুরু হয় চাকরির নানা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতির সময়কালে বহু তরুণ-তরুণী হতাশায় ভুগে, কেউ বা মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমায়।
এই ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে কিছু তরুণ গ্রামীণ অর্থনীতির হাল ধরছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কৃষি। এই কৃষি, চাষাবাদ, গবাদি পশু পালন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডকে বেছে নিয়ে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করছে এক শ্রেণির শিক্ষিত তরুণ। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন নতুন ফসল উৎপাদন করে দেশের অর্থনীতিকে যেমন উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতির ধারাকে তারা বদলে দিচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা, প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং আত্মনির্ভর হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব মারাত্মক এক সমস্যা। সরকারি-বেসরকারি চাকরি ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে এসব চাকরি শহরমুখী হওয়ায় শহরে চাপ বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে শহুরে পরিবেশ খারাপ হয়ে উঠতে শুরু করে। রাজধানী ঢাকার দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পারি, মানুষ কীভাবে একটি সময়ের পরিক্রমায় আবদ্ধ হয়ে গেছে। ঢাকামুখী উন্নয়ন ও লোকসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ফলে এক শ্রেণির শিক্ষিত তরুণ গ্রামীণ কৃষিকে বেছে নিচ্ছে।
চাকরির অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে উদ্যোক্তা হওয়াকে বেছে নিচ্ছে। শুধু কৃষি নয়, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের ফার্ম স্থাপন করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এই স্বাবলম্বিতা তাদের দিচ্ছে নিজস্ব কাজের স্বাধীনতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধশীল করে তুলছে। আজকাল স্মার্ট ফার্মিং পদ্ধতি ব্যবহার করছে সাধারণ কৃষক থেকে অনেকেই। যেখানে মোবাইল অ্যাপ, ড্রোন, সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির অবস্থা, আবহাওয়া এবং ফসলের যত্ন নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হাইড্রোপনিক্স, অর্গানিক ফার্মিং এবং ছাদ কৃষির মতো নতুন নতুন ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে অল্প জায়গায় বেশি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার মাত্রা যোগ করেছে। অনেকেই তাদের সফলতাকে ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে নতুন আরও অনেকেই কৃষিসহ অন্যান্য গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী হয়ে উঠছে। অনেকেই অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমছে এবং কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে। আগে যেখানে গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতি প্রথাগত কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল, এখন সেখানে বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি এক নতুন গতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন উদ্যোগ তৈরি হওয়ায় সেখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে। স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে নতুন নতুন উৎপাদিত পণ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন- স্ট্রবেরি চাষ, ড্রাগন, অ্যাভোকাডো, মাশরুম, বিভিন্ন নতুন জাতের ফুল চাষ, এমনকি বিদেশি ঘাস উৎপাদন করে অনেক কৃষক লাভবান হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে উৎপাদন হতো না। গ্রামাঞ্চলে এমন ইতিবাচক পরিবর্তন বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগ্রত করছে। অনেক শিক্ষিত তরুণ নিজে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং তার অর্জিত জ্ঞান দ্বারা সমাজের অন্যান্য মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ উপকৃত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়, যেমন পুঁজির অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি, প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় সমস্যা। এছাড়া বিভিন্ন সময় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়ে।
সমাধান হিসেবে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এগিয়ে আসা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার এরইমধ্যে কৃষক কার্ড প্রদান করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু শিক্ষিত তরুণদের কৃষিসহ অন্যান্য উদ্যোগে আরও অনুপ্রাণিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি, কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। যাতে সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়। শিক্ষিত তরুণদের অংশগ্রহণে গ্রামীণ কৃষি ও অর্থনীতি এক নতুন গতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যদি কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের প্রসার বৃদ্ধি পায়, তবে ভবিষ্যতে তরুণরা আরও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসবে। যেমন, অর্গানিক ফুড ব্র্যান্ড, এগ্রো-প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি কিংবা অনলাইন কৃষিপণ্য বিপণন প্ল্যাটফর্ম। এসবের বিকাশ ঘটলে কৃষি শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পে রূপ নেবে এবং রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্যের সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এমন ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গ্রামগুলো স্মার্ট গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কৃষি, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। ফলে মানুষ শুধু শহরমুখী না হয়ে গ্রাম উন্নয়নের বিকাশে কাজ করবে। এই অর্থনৈতিক রূপরেখা শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। তাই প্রয়োজন কৃষিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তরুণদের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান করা। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে শুধু বেকারত্বই কমবে না, বরং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
রাখি আক্তার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইডেন মহিলা কলেজ