প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ জুন, ২০২৬
সাধারণত থ্যালাসেমিয়া ছাড়াও রক্তস্বল্পতা, প্রসূতির রক্তক্ষরণ, অগ্নিদগ্ধ রোগী, বড় অপারেশন, দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানা কারণে রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের কোনো বিকল্প নেই। রক্তের প্রয়োজনে রক্তই দিতে হয়। আমাদের দেশে পেশাদার রক্তবিক্রেতাদের উপর নির্ভরতা দিন দিন কমছে, স্বজনদের দানের পরিমাণও বেড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় রক্তের চাহিদা আমরা এখনও মেটাতে যাচ্ছে না। অথচ রক্তদানের জন্যে ঐকান্তিক ইচ্ছাই যথেষ্ট। ধর্মীয়ভাবেও এ দান অত্যন্ত পূণ্যের কাজ। আর সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে রক্তচাহিদা পূরণে সঙ্ঘবদ্ধ সচেতনতাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। একটি জনগোষ্ঠীর অল্প কিছু অংশ সামর্থ্যবান মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন তাহলেই রক্তের অভাবে কোনো মানুষের মৃত্যু হয় না। নিয়মিত ছোট্ট এই দান নতুন করে হাসি ফোটাতে পারে লাখো মানুষের জীবনে।
আমাদের দেশে বছরে রক্তের চাহিদা আনুমানিক ১০ লাখ ইউনিট। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় রক্তের এ চাহিদা একেবারেই নগণ্য। তা হলেও এখনও আমরা স্বেচ্ছা রক্তদানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে যেহেতু কেবল রক্তই দিতে হয়; সেহেতু ব্যাপক জনসচেতনতার মাধ্যমে স্বেচ্ছা রক্তদাতা বৃদ্ধিই রক্তের এ চাহিদা মেটানো সম্ভব।
রক্তের কোনো বিকল্প হয় না। স্বেচ্ছা রক্তদাতারা সুস্থ আছেন বলেই রক্তদানের মতো মহৎ এ সেবায় নিয়োজিত থাকতে পারছেন। অনেক মানুষ আছেন যিনি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রক্তদান করার সুযোগ পান না। কারণ শারীরিক নানা জটিলতা তাকে রক্তদান করতে অনুমোদন দেয় না। একবার ভাবুন, আপনি রক্ত দিতে পারছেন, এটি আপনার সৌভাগ্য। আপনাকে রক্তগ্রহীতা হতে হয়নি। স্বেচ্ছা রক্তদানের একটা বড় অংশই অসংখ্য থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রয়োজনে লাগে। প্রতিমাসেই তাদের রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। কারও এক ব্যাগ, কারো বা দুই বা তিন ব্যাগও। রক্ত সংগ্রহ করতে দেরি হলে খাবারে অরুচি, মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাবসহ নানান উপসর্গ দেখা দেয়। রাজধানীর শান্তিনগরে কোয়ান্টাম ল্যাবের চিত্রে এমন অসংখ্য থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর অপেক্ষমাণ মুখ যে কাউকে নাড়া দেবে।
সন্ধানী, কোয়ান্টাম, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্টের মতো বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত রক্তসংকটের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে দিন-রাত। তাছাড়া ২০১৩ সালে রানা প্লাজার সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা কিংবা করোনার ভয়াবহ দাপটের সময়ও রক্তের প্রয়োজনে ছুটে এসেছেন স্বেচ্ছা রক্তদাতারা।
হ্যাঁ, দিন দিন স্বেচ্ছা রক্তদাতার সংখ্যা কিংবা সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এই গতির দিকে তাকিয়ে একজন স্বেচ্ছা রক্তদাতার মধ্যে যেন আলস্য বা অবহেলা চলে না আসে। কেননা, রক্তচাহিদা মেটাতে এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। তাই ল্যাব বা কোনো ব্যক্তির ফোনের অপেক্ষায় গড়িমসি নয়, নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান হোক একজন রক্তদাতার নিয়মিত অভ্যাস। চিকিৎসকের পরামর্শে ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে শারীরিকভাবে সুস্থ সক্ষম ব্যক্তিমাত্রই প্রতি চার মাস পর পর নিয়মিত রক্ত দিতে পারেন। এতে শরীরের তো কোনো ক্ষতি হয় না, বরং দাতা নিজেও উপকৃত হন নানাভাবে।
রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে অনেক পুণ্যের ও পরিতৃপ্তির। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন কেউ নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যখন কেউ কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ বাইবেলে বলা হয়েছে, সৎকাজ সম্পর্কে জানার পরও তা থেকে বিরত থাকা পাপ। (যাকোব ৪:১৭)
ঋগবেদে বলা হয়েছে, নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব।
সব ধর্মেই দানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা বলতে পারি যত ধরনের দান আছে তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান রক্তদান। তাই আসুন, বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের অঙ্গীকার হোক, রক্তের জন্যে আমাকে যেন ফোন না দিতে হয়, নিজ তাগিদে, নিজ উদ্যোগে সময় পূর্ণ হয়ে গেলেই আমি নিয়মিত রক্তদান করব, মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে।
শেখ মোহাম্মদ ফয়সল
কো-অর্ডিনেটর, স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন