
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সংকটের মত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য একটি স্থিতিশীল, অনুমানযোগ্য এবং ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত গন্তব্য বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত গতকাল শনিবার সকালে ‘বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্মেলন ২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বাধা এবং সরবরাহ চেইনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পটভূমিতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাকে নতুনভাবে সাজানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’ চলমান জ্বালানি সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনারদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্র নীতি বন্ধুত্বের মূল ভিত্তির ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকবে। বাংলাদেশ আপনাদের অংশীদারিত্বকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। আমরা দ্বিপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ককে পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি এবং যৌথ সমৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি। আমরা বিশ্বমঞ্চে একটি নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সক্রিয় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করার জন্য নতুনভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ব্যবসা খাত নিয়ে ব্যবসায়ীদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি এবং এই সরকার আপনাদের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ব্যবসা সহজীকরণ উন্নত করতে আমাদের সরকার গভীর কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে শুধু করদাতা হিসেবে দেখি না, বরং আমাদের প্রাথমিক কৌশলগত অংশীদার মনে করি।’
সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সব মহল থেকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এছাড়া তিনি বক্তব্যে বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন মন্ত্রী।
প্রথম চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর থাকার বিষয়টি, যা ভোক্তা চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকে প্রভাবিত করবে। ফলে রপ্তানি অবস্থান ধরে রাখতে আরও তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক বাজারের প্রভাব ও চড়া সুদের হারের কারণে উন্নত দেশগুলো যেখানে ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে, সেখানে উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই হার ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অর্থায়ন প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জলবায়ু ঝুঁকি ও ঋণের বোঝার কথা জানিয়ে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকির কারণে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে বার্ষিক অতিরিক্ত ২০ বিলিয়ন ডলার সুদ দিতে হচ্ছে, যার ফলে বৈদেশিক ঋণ এবং জলবায়ু সংকট একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।’
চতুর্থত, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির পেছনে খরচ বেড়েছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ ও সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
আশির দশকের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তৎকালীন দূরদর্শী রাষ্ট্রপতি দ্রুত কৃষি আধুনিকায়ন, বাজার উদারীকরণ এবং তৈরি পোশাক খাতের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করেছিলেন।
সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লকচেইন এবং ফাইভণ্ডজি প্রযুক্তির ব্যবহার, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে দ্রুত বদলে দিয়ে একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ দুই-ই তৈরি করছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলোকে নতুন সুযোগে রূপান্তর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পষ্ট ভিশন রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের তিনটি মূল লক্ষ্য হলো: স্থায়িত্ব আনয়ন, সংস্কার এবং উন্নয়ন।’
তিনি উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রশ্ন নিয়ে আসতে পারে, তবে তা প্রকৃত রূপান্তরের জন্য উদ্দেশ্যের স্পষ্টতাও তৈরি করে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দৃঢ প্রতিশ্রুতি আমাদের সরকারের রয়েছে।’