ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাবা : নীরব ত্যাগের বটবৃক্ষ

মায়মুনা
বাবা : নীরব ত্যাগের বটবৃক্ষ

বাবা মানেই যত উদ্ভট আবদার আর ছোট-বড় ইচ্ছা পূরণের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজকের অনেক বাবা সন্তানের বন্ধুও হয়ে উঠেছেন। যদিও আমাদের সময়ে বাবারা ছিলেন একটু রাশভারী। তার ধমক মানেই ছিল বুক কেঁপে ওঠা, পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়া, আর তার বাসায় ফেরার আগেই ঘরে ফিরে আসার এক অদৃশ্য তাড়া। তবুও সেই মানুষটিই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। কিন্তু বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো- যে মানুষটি সারাজীবন পরিবারের জন্য নিজের সমস্ত সুখ, স্বপ্ন আর ইচ্ছাকে বিসর্জন দেন, জীবনের শেষ বয়সে এসে সেই মানুষটিকেই অনেক সময় অবহেলা, একাকিত্ব আর উপেক্ষার শিকার হতে হয়। যে বাবা একসময় সন্তানদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, আজ বার্ধক্যের ভারে কাঁপতে থাকা সেই হাত ধরার মানুষটিই অনেক সময় পাশে থাকেন না। সময় বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু কিছু মানুষের হৃদয়ও যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। ফলে আজ অনেক বাবার জীবন শেষ হয় নিঃসঙ্গতা আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসে। বৃদ্ধাশ্রমের নিরব করিডোরগুলো যেন শত শত বাবার না বলা গল্পে ভরা।

সেখানে এমন অনেক বাবা আছেন, যাঁরা একসময় সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সন্তানের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, বিয়ে কিংবা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন, আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের চোখে শুধু অপেক্ষা। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, যে মানুষটি একসময় সন্তানের সামান্য জ্বরেও সারারাত জেগে থাকতেন, বৃদ্ধ বয়সে তার নিজের অসুস্থতার খোঁজ নেওয়ার মতো সময়ও অনেক সন্তানের থাকে না। অথচ সেই মানুষটিকেই বার্ধক্যে এসে অনেক সময় সহ্য করতে হয় অবহেলা আর অবমাননা।

আজকের সমাজে অনেক বাবা-মা নিজেদের ঘরেই যেন অতিথি হয়ে যাচ্ছেন। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে আধুনিক করেছে ঠিকই; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতাকে করেছে সংকীর্ণ। ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি, সেই মানুষগুলোর কথা, যারা নিজেদের পুরো যৌবন আমাদের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। একসময় যে বাবা সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতেন, আজ সেই বাবাকেই একা হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকতে দেখা যায়। অনেক বাবা আছেন, যারা কষ্ট পেলেও কিছু বলেন না। কারণ তারা অভিমান করতেও জানেন নীরবে বুকভরা যন্ত্রণা নিয়েও তারা শুধু সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। এটাই হয়তো বাবাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তারা ভেঙে পড়েন; কিন্তু পরিবারকে ভাঙতে দেন না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাবা-মা কখনো বোঝা নন। তারা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। একটি গাছ যেমন শিকড় ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি একজন মানুষও বাবা-মায়ের দোয়া, ভালোবাসা আর আশীর্বাদ ছাড়া প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পায় না।

জীবনের ব্যস্ততা যতই থাকুক না কেন, বাবার পাশে কিছুটা সময় বসা, তাঁর কথা শোনা, তার একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়াই হতে পারে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি। কারণ যে মানুষটি পুরো জীবন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে কাটিয়ে দিলেন, তার শেষ সময়টুকু যেন ভালোবাসা, সম্মান আর আপন মানুষের উষ্ণতায় ভরে ওঠে এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি সন্তানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্য।

মায়মুনা

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলাকলেজ (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত