প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ জুন, ২০২৬
একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনে কার্ডভিত্তিক লেনদেন ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের জীবনমান সহজ করতে বিভিন্ন ধরনের কার্ড প্রদানের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ। রাষ্ট্রীয় সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই ধরনের ডিজিটাল উদ্যোগ নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণের পথকে অনেক বেশি প্রশস্ত ও সুগম করে তুলতে পারে।
বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি যে, তৃণমূল বা ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা বিতরণে নানাবিধ অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। একটি সমন্বিত এবং কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ না থাকার কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রায়শই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর ফলে দেখা গেছে, যে ব্যক্তি একটি ভাতা পাওয়ার পর অন্য কোনো ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন, তিনিই অনৈতিকভাবে একাধিক তালিকাভুক্ত হয়ে সরকারি তহবিলের অপচয় ঘটিয়েছেন।
পূর্ববর্তী ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা ছিল মানবিক ত্রুটি এবং ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপত্তি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রাপকের মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নিজেদের মোবাইল নম্বর ইনপুট দিয়ে সরকারি ভাতার অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এই ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও জবাবদিহিতার অভাব ভালো একটি উদ্যোগকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত করে তুলেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কার্ডনির্ভর কল্যাণমূলক কাজের জন্য আলাদা আলাদা কার্ড তৈরি করতে গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রতিটি কার্ডের নকশা, চিপ স্থাপন, বিতরণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে যে বিশাল অংকের বাজেট এবং সময়ের অপচয় হবে, তা একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বড় রকমের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই অপচয় রোধে একক ও সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। এই বহুমুখী সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর এবং বৈপ্লবিক সমাধান হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডিকে একটি ‘মাস্টার কার্ড’ হিসেবে রূপান্তর করা। দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের কাছে এরই মধ্যে একটি অনন্য আইডেন্টিফিকেশন নম্বরসহ স্মার্ট এনআইডি কার্ড রয়েছে। এই বিদ্যমান অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই সমস্ত সরকারি সেবাকে একটি একক ছাতার নিচে নিয়ে আসা সম্ভব।
প্রস্তাবিত এই মাস্টার কার্ডব্যবস্থার প্রথম ধাপে সকল ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও ভাতার তথ্য নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। যখনই একজন নাগরিকের এনআইডি কোনো একটি ভাতার জন্য নিবন্ধিত হবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার প্রোফাইল অন্য সব সমজাতীয় ভাতার জন্য লক হয়ে যাবে। এর ফলে একই ব্যক্তির অবৈধভাবে একাধিক সুবিধা ভোগ করার সমস্ত পথ বন্ধ হবে।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সুবিধাভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নিবন্ধিত বায়োমেট্রিক সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট যুক্ত করা।
সরকারি ভাতার অর্থ সরাসরি সেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে প্রেরিত হবে যা কেবল ওই নির্দিষ্ট নাগরিকের এনআইডি দ্বারা যাচাইকৃত। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্যের টাকা নিজের ফোনে নিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই সমন্বিত প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে সরকারি প্রকল্পগুলো অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সফল, সার্থক ও শতভাগ বিতর্কহীন হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যখন প্রতিটি টাকার হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে, তখন জনগণের মাঝে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
জাতীয় পরিচয়পত্রকে মাস্টার কার্ডে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও এর মাধ্যমে মূলধারার ডিজিটাল অর্থায়নের আওতায় চলে আসবে। একটিমাত্র কার্ড পকেটে নিয়ে নাগরিকরা তাদের পরিচয় প্রমাণের পাশাপাশি সব ধরনের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
এই রূপরেখা সফল করতে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র উইং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে একটি সমন্বিত এপিআই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো সরকারি মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নিমেষেই একজন আবেদনকারীর যোগ্যতা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নিতে পারবে। ডেটা শেয়ারিং এর এই আধুনিকায়ন পুরো শাসনব্যবস্থাকে গতিশীল করবে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এই একক কার্ড ব্যবস্থা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সুরক্ষিত হবে। আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন যুক্ত করার মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব। ডেটাবেজের কঠোর নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করলে কোনো ধরনের সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে জনগণের তথ্য চুরি বা জালিয়াতি করার সুযোগ থাকবে না। প্রযুক্তির এই আধুনিকায়ন দেশের প্রান্তিক মানুষের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেবে। ভাতার টাকা পেতে তাদের আর কোনো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা দালালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে অণুনয়-বিনয় করতে হবে না। রাষ্ট্র সরাসরি তার নাগরিকের মোবাইল স্ক্রিনে অধিকার পৌঁছে দেবে, যা প্রকৃত অর্থেই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল দর্শন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই সমন্বিত প্রযুক্তি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এক বিশাল সাশ্রয় এনে দেবে। কোটি কোটি আলাদা প্লাস্টিক বা চিপ কার্ড মুদ্রণের খরচ বেঁচে যাওয়ায় সেই উদ্বৃত্ত অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার এটি একটি অসামান্য উদাহরণ হতে পারে।
এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এই মাস্টার কার্ডের ব্যবহার ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক যখন এই প্রযুক্তির অংশীদার হবে, তখনই এর আসল সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছাবে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যাত্রায় তরুণ প্রজন্মের আইটি বিশেষজ্ঞদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই সমন্বিত সফটওয়্যার সলিউশন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। স্বনির্ভর ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্ডনির্ভর জনকল্যাণমুখী উদ্যোগকে শতভাগ সফল করতে সমন্বিত ‘স্মার্ট কার্ড’ প্রযুক্তি সময়ের দাবি। দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন করলে একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। প্রযুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত এই নতুন বাংলাদেশ হবে বিশ্বমঞ্চে প্রগতি ও সুশাসনের এক অনন্য রোল মডেল।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক