ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শৈশব চুরির নির্মম মহোৎসব

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
শৈশব চুরির নির্মম মহোৎসব

লাল শাড়িতে জড়ানো একটি ছোট্ট মেয়ের চোখে যখন আগামী দিনের স্বপ্নের বদলে এক অজানা আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে, তখন একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি মূলত ভেতর থেকেই কেঁপে ওঠে। আমাদের চারপাশের অতি পরিচিত এই দৃশ্যটি আজও এক নির্মম বাস্তবতার গল্প বলে, যার নাম বাল্যবিবাহ। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার আজও অন্যতম সর্বোচ্চ। এখানে ৫১ শতাংশেরও বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো, ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয় প্রায় ১৫ শতাংশ কিশোরী। এই বিশাল পরিসংখ্যান কেবল কাগজের হিসাব নয়; এটি লাখো মেয়ের অকালে ঝরে পড়া স্বপ্নের নীরব প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা বদ্ধমূল মানসিকতাই মূলত এই সামাজিক ব্যাধিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই যতদিন আমরা কন্যাশিশুকে বোঝা হিসেবে দেখার প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে না পারব, ততদিন এই অমানবিক অভিশাপের শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে না।

?একটি শিশুর হাতে যখন বই-খাতার বদলে সংসারের কঠিন দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বাভাবিক পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিভিন্ন জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপের উপাত্ত বলছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরী মায়েদের গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্মদানে মৃত্যুর ঝুঁকি ২০ বা তার বেশি বয়সি নারীদের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর এই উচ্চ হারের পেছনে বাল্যবিবাহ নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে কেবল মায়ের জীবনই বিপন্ন হয় না, বরং নবজাতকও অপুষ্টি ও নানা জটিল শারীরিক ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) তথ্যমতে, দেশে কিশোরী মাতৃত্বের হার এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। একটি সুস্থ ও সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার জাতীয় স্বপ্ন কখনোই ভগ্নস্বাস্থ্যের কিশোরী মায়েদের কাঁধে ভর করে বাস্তবায়িত হতে পারে না।

?বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকেও ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ব্যানবেইস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের বিপুল হারে ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই বাল্যবিবাহ। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাল্যবিবাহের কারণে নারীদের আয় করার সক্ষমতা প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এর ফলে রাষ্ট্র প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক অবদান থেকে বঞ্চিত হয়। পড়াশোনা শেষ করার আগেই জোরপূর্বক সংসার জীবনে প্রবেশ করানোয় এসব মেয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে না। ফলে তারা আজীবন অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায় এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী, সেই নারীদের শিক্ষাক্ষেত্র থেকে এভাবে অকালে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো দেশের সার্বিক জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে স্বেচ্ছায় বাধাগ্রস্ত করা। আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব এবং সর্বস্তরে সামাজিক সচেতনতার ঘাটতিই বাল্যবিবাহ নামক এই ক্যানসারকে সমাজে বিস্তার লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে। দেশে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭’ কার্যকর আছে, যেখানে অপরাধীদের জন্য স্পষ্ট শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর ও সামাজিক নীরবতার কারণে এর কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন আজও অধরাই রয়ে গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক করোনা মহামারিকালে যখন দীর্ঘদিন স্কুলগুলো বন্ধ ছিল, তখন দেশে বাল্যবিবাহের হার উদ্বেগজনকভাবে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই হতাশাজনক তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল সংসদে আইন প্রণয়ন করেই এই গভীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি ঘরে ব্যাপক সামাজিক জাগরণ। বাল্যবিবাহের এই অন্ধকার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত, বহুমাত্রিক ও কঠোর পদক্ষেপের। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। কিশোরীদের শিক্ষায় বিনিয়োগকৃত প্রতিটি টাকার বিপরীতে অর্থনীতি কয়েক গুণ বেশি লাভবান হতে পারে। গ্রামীণ পর্যায়ে কিশোরী ক্লাব গঠন, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন নিশ্চিত করা, স্থানীয় প্রশাসন ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করলেই কেবল এই মহামারি রোধ করা সম্ভব। বাল্যবিবাহের শেষ কোথায়, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সম্মিলিত বিবেকে; কারণ একটি সুরক্ষিত শৈশবই গড়ে তুলতে পারে একটি সমৃদ্ধ ও আলোকিত জাতি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত