ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জলবায়ু সংকট ও বাংলাদেশ : সম্মুখসমরে তরুণ প্রজন্ম

লাবনী আক্তার শিমলা, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জলবায়ু সংকট ও বাংলাদেশ : সম্মুখসমরে তরুণ প্রজন্ম

বিশ্ব যখন তার অনিন্দ্য সৌন্দর্য হারাচ্ছে পরিবর্তনের গ্রাসে, মানুষ তখন হারাচ্ছে তার বসবাসের অনুকূল স্থান। দীর্ঘ সময়ের আবহাওয়ার পরিবর্তন ভাঙছে পৃথিবীর চিরচেনা নিয়ম, শৃঙ্খল। আর এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মানবসভ্যতা। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নদীভাঙন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘনঘন বন্যা, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, অধিক বৃষ্টি, কখনো বৃষ্টিশূন্যতা- এই চিত্রগুলো স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এই পরিস্থিতির চরম শিকার। তবে বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চল, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপদে পড়ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৯০% মানুষ চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে থাকবে এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পথে। কিন্তু এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখাতে পারে দেশের তরুণ প্রজন্ম। তারা এখন আর শুধু ‘ভবিষ্যতের নাগরিক’ নয়, বরং জলবায়ু অ্যাকশনের সম্মুখসারির যোদ্ধা।

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স এবং আইসিসিএডি (ICCCAD)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্বব্যাংকের ‘অ্যান আনসাসটেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে অতিরিক্ত তাপমাত্রার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গরমের দিনে ডায়রিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৪৭.৭% এবং তীব্র কাশির সমস্যা ২২.৭% বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া ক্লান্তি ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। ল্যানসেট কাউন্টডাউনের হিসাব মতে, তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক বছরে গড়ে প্রায় ৩৯১ কর্মঘণ্টা হারিয়ে ফেলেন, যেখানে কৃষিশ্রমিকদের ক্ষতি আরও বেশি (গড়ে প্রায় ৭৩২ কর্মঘণ্টা)। কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অসুস্থতার কারণে নষ্ট হওয়া পঁচিশ কোটি কর্মদিবসের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের (যেমন: সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট) জমিতে নোনা পানি ঢুকে পড়ছে। ফলে লাখ লাখ হেক্টর জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় চলে আসছে, যার ফলে ঢাকা শহরের বস্তি অঞ্চলগুলোতে মানুষের চাপ এবং নাগরিক সংকট তীব্র হচ্ছে। ফলে বাড়ছে যানজট, দূষণ, জলাবদ্ধতা ও অসুস্থতা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একমাত্র প্রবালপ্রাচীর ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এখন সময় এই জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক বিভিন্ন অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ও প্রতিহত করার। আর এই যাত্রায় আজ অগ্রণী তরুণ প্রজন্ম। তরুণরা বর্তমানে নিজেদেরকে পরিবেশ আন্দোলনে অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছে, বিশেষত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে। নবায়নযোগ্য শক্তি, কার্বন ক্যাপচার এবং টেকসই কৃষি নিয়ে গবেষণায় তরুণ বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারা এগিয়ে আছে।

গ্রিন স্টার্টআপগুলো পরিবেশবান্ধব ব্যবসার নতুন মডেল তৈরি করছে, যা একই সঙ্গে অর্থনীতি ও পরিবেশ- দুটোকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এবং ব্রাইটার্স-এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘ইয়ুথ কপ’-এ দেশের ১০০-র বেশি তরুণ জলবায়ু কর্মী একত্রিত হয়ে একটি ২৬-দফা ‘ইয়ুথ চার্টার’ বা যুব সনদ পেশ করেছে।

যার মূল দাবি ছিল- নীতি নির্ধারণে তরুণদের কেবল প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়, বরং জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া। ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ এবং ‘ফান্ড আওয়ার ফিউচার’ ক্যাম্পেইনের আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ২৬টি জেলায় হাজার হাজার তরুণ জলবায়ু স্ট্রাইক ও বোট র‌্যালির মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দাবি জানাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইয়ুথ এনভায়রনমেন্টাল ইনিশিয়েটিভস (BYEI)-এর ‘YUVA’ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণরা সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সরাসরি কাজ করছে। ‘ইয়ুথ ক্লাইমেট গ্র্যান্ট ২০২৬’-এর মতো উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে তরুণরা এখন জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (প্লাস্টিক দূষণ রোধ) এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন (WASH) নিয়ে সরাসরি কাজ করছে।

এ ছাড়াও, প্রতিটি জলবায়ুবান্ধব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য জনমত ও জনসমর্থন গড়ে তোলা তরুণদের অন্যতম দায়িত্ব। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব লাইফস্টাইল (যেমন: থ্রি-আর পলিসি- Reduce, Reuse, Recycle) প্রচার করা অতীব জরুরি। এই সমস্ত উদ্যোগ সফল করতে হলে আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের সম্পদ ধ্বংস ও অপচয় রোধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সহজলভ্যকরণে গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্যকরী প্রকল্প তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও গবেষণার বিকল্প নেই। তৃতীয়ত, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন সব প্রতিষ্ঠান, কার্যক্রম ও উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও অসহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সমর্থন ও অংশগ্রহণ সৃষ্টি করতে হবে।

এ ছাড়াও, কৃষি, গাছ রোপণ ও সবুজ অর্থনীতিতে তরুণদের স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ করা অতীব জরুরি। সর্বোপরি, প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি নির্মূলের উদ্যোগ নিতে হবে, সেই সঙ্গে এর বিকল্প লাভজনক পণ্য তৈরি করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সম্মুখসারির যুদ্ধে তরুণরা এগিয়ে আসুক। সেই সঙ্গে তাদের প্রতিটি সৎ ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে আমাদের সবার সহযোগিতা হোক নজিরবিহীন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত