ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

টানা বর্ষণ : প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষা

ডা.মাহতাব হোসাইন মাজেদ
টানা বর্ষণ : প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষা

বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। পাহাড়ি ঢল, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের কারণে জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নতুন পূর্বাভাসে আগামী পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার তথ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাঠে থাকলেও সাধারণ মানুষের সতর্কতা ও প্রস্তুতিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দেশজুড়ে কয়েক দিনের টানা বর্ষণে জনজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। কোথাও বন্যা, কোথাও জলাবদ্ধতা, আবার কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনায় বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে এবং নিম্নাঞ্চলে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। কোথাও কোথাও মাঝারি, ভারি এমনকি অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী তিন দিন রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।

সোমবারের পরও বৃষ্টির ধারা পুরোপুরি থামবে না। মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বর্ধিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমতে পারে। এই সময়ে দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

কেন বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা : আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উত্তর ভারতের মধ্য উত্তরপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করা দুর্বল লঘুচাপ এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের ওপর বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

মৌসুমি বায়ুর অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি অংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রসারিত। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য প্রবল থাকায় আর্দ্রতাসমৃদ্ধ মেঘ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করছে। ফলে টানা বৃষ্টির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, বাড়ছে বন্যার শঙ্কা : গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরইমধ্যে কিছু এলাকায় কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

১৯ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কবার্তা : দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেওয়া বিশেষ পূর্বাভাসে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সন্ধ্যার মধ্যে ১৯ জেলার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।

এ কারণে রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। নৌযানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

দুর্ভোগে সাধারণ মানুষের জীবন : টানা বর্ষণে শহর ও গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক ডুবে গেছে, যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

কোথাও কোথাও বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিম্নাঞ্চলের অনেক পরিবার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুর্গত মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিতে বাড়ছে উদ্বেগ : অবিরাম বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার আমনের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং মাছের ঘের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি বিভাগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা : দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা থাকলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও অন্যান্য সংক্রমণের ছুঁকি বাড়তে পারে। চিকিৎসকরা বিশুদ্ধ পানি পান, খাবার ঢেকে রাখা এবং শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় সাপের উপদ্রব বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় চাপ : ভারি বর্ষণ ও দমকা হাওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ধস কিংবা গাছ উপড়ে পড়লে সড়ক যোগাযোগও ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে জরুরি সেবাগুলো সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রস্তুতি জোরদার করেছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা : চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে জনগণের পাশে থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম : চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধসের উচ্চঝুঁকিতে থাকা প্রায় ২২১টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক থেকে মাটি ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

জরুরি সেবায় প্রস্তুতি : দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, উদ্ধার সরঞ্জাম মজুত এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

নাগরিকদের করণীয় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারি বর্ষণের সময় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই নিরাপদ। পাহাড়ি এলাকা, নদীতীর ও জলাবদ্ধ সড়ক এড়িয়ে চলতে হবে। মোবাইল ফোন চার্জ রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় অবস্থান না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, আবহাওয়ার বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলো মাঠে থাকলেও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা, সময়মতো সতর্কবার্তা অনুসরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা। প্রকৃতির এই বৈরী পরিস্থিতিতে আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা, প্রস্তুতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাই হতে পারে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ডা.মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত