ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বন্যার করাল গ্রাস : স্থায়ী সমাধানের পথ কি অধরাই থাকবে?

বন্যার করাল গ্রাস : স্থায়ী সমাধানের পথ কি অধরাই থাকবে?

বাংলাদেশ ও বন্যা যেন এক অবিচ্ছেদ্য, অথচ নির্মম বাস্তবতার নাম। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল প্লাবিত হয়, লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা অতীতের অনেক রেকর্ডকে ম্লান করে দিয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা অতিবর্ষণ দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাকে এক মহাসংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তলিয়ে গেছে লাখ লাখ একর ফসলি জমি, ভেসে গেছে হাজারো পুকুরের মাছ, আর আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে লাখো বনি-আদম।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত ছবি এবং খবরাখবর আমাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে। বানের পানিতে ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ির চালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ, কিংবা বুক সমান পানি ভেঙে কোলের শিশুকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটা মায়ের আকুতি- কোনো সংবেদনশীল মানুষকে স্থির থাকতে দেয় না। তবে কেবল দুঃখপ্রকাশ বা তাৎক্ষণিক ত্রাণের চাদরে এই মানবিক বিপর্যয়কে ঢেকে রাখা যাবে না। এখন সময় এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলার- প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে আমরা আর কতকাল এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করে থাকব? আমাদের দুর্যোগব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মহাপরিকল্পনাগুলো আসলে কোথায় থমকে আছে?

সংকটের বহুমাত্রিক রূপ ও তাৎক্ষণিক করণীয় : চলতি বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অবকাঠামোর ওপর। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও কালভার্ট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো সমন্বিত ও গতিশীল উদ্ধার অভিযান।

আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তা : বন্যাদুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে আলো, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা রাখা জরুরি।

জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা : শুকনো খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি পৌঁছানোর পাশাপাশি মেডিকেল টিম গঠন করে উপদ্রুত এলাকায় পাঠাতে হবে, যাতে বন্যার ভেতরে বা বন্যা-পরবর্তী সময়ে কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় : শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর ভরসা না করে বেসরকারি সংস্থা, ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন, যাতে ত্রাণের অপচয় না হয় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছায়।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি : আমরা প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করি। এটি সত্য যে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার আচরণ চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে- কখনও অনাবৃষ্টি, আবার কখনও বা কয়েক দিনে পুরো মাসের বৃষ্টিপাত একসঙ্গে হওয়া। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা ও বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতাও কম দায়ী নয়।

প্রতি বছর বন্যার পর নদী ড্রেজিং বা খনন এবং বাঁধ মেরামতের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেই কাজের অগ্রগতি কতটুকু হয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। বর্ষা আসার ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বাঁধ মেরামতের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আসলে বালির বাঁধ দিয়ে জোয়ার আটকানোর মতোই নিষ্ফল।

তাছাড়া, বাংলাদেশের বন্যার সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও অবমুক্তকরণের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদীর উজান থেকে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়া বা শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখার যে একতরফা নীতি, তা আমাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির টেবিলে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সীমান্ত নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর চুক্তি নিশ্চিত করা না গেলে, প্রতি বছর বর্ষায় আমাদের এই কান্নার ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হতেই থাকবে।

চাই টেকসই ও দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা : বন্যাকে পুরোপুরি রোধ করা হয়তো ভৌগোলিক কারণে সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষয়ক্ষতি ও ভয়াবহতা কমিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ যদি সমুদ্রের বুক থেকে জমি উদ্ধার করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে, তবে আমরা কেন সঠিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না?

১. নদী খনন ও নাব্যতা বৃদ্ধি : দেশের প্রধান নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই নামমাত্র খনন না করে, বৈজ্ঞানিক উপায়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।

২. টেকসই বাঁধ নির্মাণ : উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় সনাতন পদ্ধতির মাটির বাঁধের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও টেকসই কংক্রিটের গাইড ওয়াল বা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

৩. আঞ্চলিক কূটনীতি জোরদার : উজানের দেশগুলোর সাথে বর্ষা মৌসুমে পানি ছাড়ার আগাম তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাকে আরও নিখুঁত ও গতিশীল করতে হবে, যাতে মানুষ অন্তত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়। ‘ত্রাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, মানুষের প্রয়োজন বেঁচে থাকার ও ঘুরে দাঁড়ানোর স্থায়ী নিশ্চয়তা।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত