ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শান্তি চুক্তির তিন দশক পরেও কেন অশান্তি, অবৈধ অস্ত্র ও বিভাজনের রাজনীতি

এম মহাসিন মিয়া
শান্তি চুক্তির তিন দশক পরেও কেন অশান্তি, অবৈধ অস্ত্র ও বিভাজনের রাজনীতি

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতের অবসান, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্র ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই চুক্তি সম্পাদিত হয়।

সে সময় দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামবে, সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি ও সম্প্রীতির অঞ্চলে পরিণত হবে। কিন্তু শান্তি চুক্তির প্রায় তিন দশক পরও প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে! যদি শান্তি চুক্তিই ছিল সমাধানের পথ, তবে আজও কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ শোনা যায়? কেন বিভিন্ন সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান? কেন সাধারণ মানুষ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসের কথা বলেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা জটিল এবং এখানে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূমি, পরিচয়, উন্নয়ন, প্রশাসন এবং নিরাপত্তার মতো একাধিক বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

?শান্তি চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পক্ষ চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতপ্রকাশ করেছে। একদিকে এমন মত রয়েছে যে, চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, যদি সংলাপ ও সাংবিধানিক রাজনীতির পথ খোলা থাকে, তাহলে অস্ত্রধারী রাজনীতির যৌক্তিকতা কোথায়? যদিও প্রকৃত পক্ষে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক ছিল এবং সরকারের আন্তরিকতার ফলেই বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে, তারপরও পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি? কেন এত অশান্তি, বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি?

সময়ের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের উত্থান ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) জেএসএস (সংস্কার) সহ বিভিন্ন অংশ, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ), মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি) এবং আরও কয়েকটি সংগঠনের নাম গণমাধ্যম, নিরাপত্তা সংস্থার বিবৃতি ও জনআলোচনায় এসেছে। এসব সংগঠন নিজেদের অবস্থানের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরলেও, প্রকৃত পক্ষে সমালোচকেরা মনে করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র রাজনীতির ধারাবাহিকতাই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে মূল বাধা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গুম, খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাকাণ্ড এবং সংঘর্ষের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, শ্রমিক কিংবা সাধারণ নাগরিকসহ অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী আসলে কারা? উত্তর একটাই, সাধারণ মানুষ।

যে অঞ্চলে বিনিয়োগের আগে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়, সেখানে শিল্প গড়ে ওঠে না। যেখানে শিক্ষক, চিকিৎসক, পর্যটক কিংবা ব্যবসায়ী নিরাপদ বোধ করেন না, সেখানে উন্নয়নের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলো নিরাপত্তা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কথিত মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

যদিও একটি রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচারও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। বহু বছর ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কতৃক সুপরিকল্পিতভাবেই সন্দেহ, ভয় ও বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কোনো একটি পক্ষের জন্য নয়, বরং পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ক্ষতিকর। কারণ পাহাড়ে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিক, তিনি যে সম্প্রদায়েরই হোন না কেন, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার রাখেন।

বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় পক্ষের রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে। মতভেদও থাকতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তার সমাধান অবৈধ অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং সংলাপ, সংবিধান, আইন এবং জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে হওয়া উচিত। একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, কোনো গোষ্ঠী যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তায়।

আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠন। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে পাহাড়ের শিশু বই হাতে স্কুলে যাবে, কৃষক নিশ্চিন্তে জমিতে কাজ করবেন, ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করবেন, দেশ-বিদেশ থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটকগণ নিশ্চিন্তে ভ্রমণ ও নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারবে এবং কোনো নাগরিকই নিজের পরিচয়ের কারণে ভয় অনুভব করবেন না। শান্তি চুক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন রাজনৈতিক মতভেদ দেশের প্রচলিত সংবিধান, আইন ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হবে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের আওতায় আসবে এবং উন্নয়নের সুফল সকল সম্প্রদায় সমানভাবে ভোগ করবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অঞ্চলকে সংঘাতের প্রতীক নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শিক্ষা, পর্যটন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব। শান্তি চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দিয়েছে, এখন সেই ভিত্তির ওপর টেকসই শান্তি নির্মাণের দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় জনগণ, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। কিন্তু অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে নয়।

শান্তি কেবল একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় পারস্পরিক আস্থা, সংবিধান ও আইনের শাসন, সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং অবৈধ অস্ত্রের রাজনীতি ও সহিংসতার পরিবর্তে সংবিধান ও আইনের আলোকে সংলাপকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যত নিরাপদ, আরও সমৃদ্ধ এবং আরও উন্নত ও স্থিতিশীল হবে।

এম মহাসিন মিয়া

লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত