প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জুলাই, ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর ছোবলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। এখানে বন্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এক চলমান অস্তিত্ব সংকটের নাম। প্রতিবছর বর্ষার পানিতে নিম্নাঞ্চলগুলো কেবল কৃষিজমিই হারায় না, তলিয়ে যায় কোটি মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা। আইপিসিসির (IPCC) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যা জলবায়ু বিপর্যয়ের একটি প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ রূপ, যা আমাদের জাতীয় অগ্রগতিকে ক্রমাগত ব্যাহত করছে। এখনই বাস্তবতা মেনে নিয়ে সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি; অন্যথায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল তাপমাত্রাই বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে আমাদের নদ-নদী ও বৃষ্টিপাতের চিরচেনা আচরণ। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় বর্ষার অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোর পানিপ্রবাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকা এখন ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল বন্যার তীব্রতাই বাড়ায়নি, বরং এর স্থায়িত্ব ও ক্ষতির ধরনকেও আমূল পাল্টে দিয়েছে। অর্থাৎ, এখন আর শুধু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বন্যা হয় না; দীর্ঘস্থায়ী এই জলদুর্যোগ যেন এক ধীরগতির বিপর্যয়, যা সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতিকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
বন্যার আরেকটি ভয়াবহ রূপ দেখা যায় উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জোয়ারের লোনা পানি সহজেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২১০০ সালের মধ্যে এই উচ্চতা ১৪ থেকে ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ তার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ হারাতে পারে। এর ফলে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি চিরতরে লবণাক্ত পানির গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এই লবণাক্ততা কেবল ফসলই ধ্বংস করছে না, এটি উপকূলের মিঠাপানির উৎসগুলোকেও পানের অযোগ্য করে তুলছে।
ফলস্বরূপ, সেখানকার কোটি মানুষের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এর প্রভাব মারাত্মক। ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাত্র দুই দশকে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩.৭২ বিলিয়ন (৩৭২ কোটি) মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ভয়াবহ বন্যার সময় দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মোট ক্ষতির প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি খরচের ওপর আঘাত হানে। অর্থাৎ, বন্যা শুধু রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোই ভাঙে না, এটি একটি সাধারণ পরিবারের চুলার আগুনও নিভিয়ে দেয়; ভাসিয়ে নেয় তাদের সঞ্চিত পুঁজি ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে।
বন্যার ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি এখন অন্যতম বড় এক মানবিক সংকটের নাম। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন বা বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রে বিশ্বের খুব কম দেশই বাংলাদেশের মতো এতটা ক্ষতিগ্রস্ত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের একজন জলবায়ুর কারণে বাস্তুচ্যুত হবে।
আগামী ৩০ বছরে কৃষি ও পানি সংকটের কারণে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হবে। শুধু তা-ই নয়, ২০১৯ সালেই প্রায় ৪১ লাখ মানুষকে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে নিজ বসতভিটা ছাড়তে হয়েছে। এই মানুষগুলো যখন বাধ্য হয়ে শহরে আশ্রয় নেয়, তখন তারা আরও বেশি অসহায়ত্ব ও দারিদ্র্যের শিকার হয়, যা শহরগুলোর ওপরও চরম চাপ সৃষ্টি করে। বন্যার সবচেয়ে নির্মম আঘাতটি নেমে আসে নদীভাঙনের শিকার ও চরাঞ্চলের মানুষের ওপর, যাদের কথা মূলধারার আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। এই অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর সবকিছু হারিয়ে শূন্য হাতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বন্যার কারণে চরাঞ্চলের মানুষ কাজের সুযোগ হারায় এবং তাদের আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কমে যায়। নদীবিধ্বস্ত এই মানুষগুলো প্রতিবছর ভিটেমাটি হারিয়ে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুতে’ পরিণত হয়।
তাদের এই বুকফাটা যন্ত্রণা কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। কারণ, তাদের কাছে বন্যা স্রেফ কোনো ঋতুভিত্তিক ঘটনা নয়, বরং এটি অস্তিত্বের ওপর নেমে আসা এক নিয়মিত মৃত্যুফাঁদ, যা তাদের জীবনকে ঠেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে বন্যাকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা বা শতভাগ নিয়ন্ত্রণে আনা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই আমাদের মনোযোগ এখন প্রতিরোধের চেয়ে অভিযোজনের (Adaptation) দিকেই বেশি নিবদ্ধ করা উচিত। গবেষণায় প্রমাণিত, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। যেমন- সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে উপকূলীয় অঞ্চলকে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা থেকে রক্ষা করে।
অথচ আমরা আজও প্রচলিত বাঁধ নির্মাণের পেছনেই বেশি ছুটছি, যা অনেক ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে উল্টো নতুন বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মিলে চলার এই দর্শনকেই আমাদের জাতীয় নীতিমালার মূল স্তম্ভ করতে হবে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ ও স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি, যেখানে বন্যার পানি ধ্বংসলীলা না চালিয়ে জীবনধারণের সহায়ক হয়ে উঠবে।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ